২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন দেশের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম আলোচিত ঘটনা ছিল। সে সময় ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তাদের হাত থেকে চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের কাছে চলে যায়। প্রায় আট বছর পর বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) একটি তদন্ত প্রতিবেদন সেই ঘটনাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
হাইকোর্টে জমা দেওয়া বিএফআইইউর প্রতিবেদনে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেএমসি বিল্ডার্সের প্রতিনিধি হিসেবে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে দায়িত্ব পালনকালে তিনি এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ার অংশ ছিলেন। তদন্তে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, চারটি স্বাধীন নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুসন্ধানেও এ বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে, যা পরে একটি আন্তর্জাতিক ফরেনসিক প্রতিষ্ঠান যাচাই করেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সালে সরকারের প্রত্যক্ষ সমর্থনে এবং ব্যাংক কোম্পানি আইনের বিভিন্ন বিধান উপেক্ষা করে এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ৮২ শতাংশ শেয়ারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে শেয়ার সংগ্রহ করে পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয় এবং সেখানে এস আলম-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
সে সময় জেএমসি বিল্ডার্সের প্রতিনিধি হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন ব্যাংকের পরিচালক এবং পরে ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার আগে তিনি ওই পদ ছেড়ে দেন।
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর হাইকোর্টের নির্দেশে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার অধিগ্রহণ, অর্থ আত্মসাৎ ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত শুরু করে বিএফআইইউ। দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে আদালতে ৪২ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।
তদন্তে দাবি করা হয়েছে, জেএমসি বিল্ডার্স ব্যাংক থেকে অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ বের করে সেই অর্থ দিয়েই ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার কিনেছিল। অর্থাৎ ব্যাংকের নিজস্ব অর্থ ব্যবহার করেই মালিকানা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের পর এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে বিপুল অঙ্কের ঋণ অনুমোদনের অভিযোগও প্রতিবেদনে রয়েছে। এতে যথাযথ ঝুঁকি মূল্যায়ন অনুসরণ করা হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে, যার ফলে ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে তারল্য সংকট সৃষ্টি হয়।
বর্তমান ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ২০২৫ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনসহ ২১ জনের বিরুদ্ধে শেয়ার জালিয়াতি, প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ ও ব্যাংকের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে মামলা করে। মামলাটি বর্তমানে হাইকোর্টে বিচারাধীন।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লিখিত সব তথ্য ও অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। সংশ্লিষ্টদের দায়-দায়িত্ব সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালতই নির্ধারণ করবেন। তাই এসব বিষয় বর্তমানে অভিযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

