গ্রীষ্মকালের অন্যতম জনপ্রিয় এবং সুস্বাদু ফল আম। মিষ্টি স্বাদ আর চমৎকার পুষ্টিগুণের জন্য একে ‘ফলের রাজা’ বলা হয়। তবে অতি প্রিয় এই ফলটিই অসতর্কতার কারণে কখনো কখনো মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। সম্প্রতি খুলনার কয়রা উপজেলার মহারাজপুরে আম খাওয়ার পর ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে এক নারীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে; একই পরিবারের আরও চারজন বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
শুধু বাংলাদেশেই নয়, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও আম খাওয়ার পর অসুস্থ হওয়া কিংবা মৃত্যুর মতো বেশ কিছু মারাত্মক ঘটনা ঘটেছে। চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং বিভিন্ন ঘটনা পর্যালোচনা করে আম খাওয়ার পর এমন আকস্মিক বিপর্যয়ের পেছনে প্রধানত ৩টি কারণ খুঁজে পেয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

আমের মৌসুম শুরুর আগে বা সংরক্ষণের জন্য অনেক সময় অসাধু ব্যবসায়ীরা ক্ষতিকর রাসায়নিক বা কীটনাশক ব্যবহার করে থাকে, যা আমকে বিষাক্ত করে তোলে।
আমে ব্যবহৃত তীব্র কীটনাশক শরীরে প্রবেশ করলে তা দ্রুত মানুষের স্নায়ুতন্ত্রকে অচল করে দেয়। ২০১৮ সালে ভারতের উত্তরপ্রদেশে কীটনাশকযুক্ত আম খেয়ে এক শিশুর মৃত্যু হয় এবং তার তিন ভাইবোন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। চিকিৎসকরা একে ‘অর্গানোফসফেট পয়জনিং’ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
আম পাকাতে ব্যবহৃত ক্যালসিয়াম কার্বাইড থেকে আর্সেনিক ও ফসফরাসের মতো বিষাক্ত উপাদান তৈরি হয়। এটি পাকস্থলীর আলসার, কিডনি নষ্ট হওয়া এবং অতিরিক্ত ডায়রিয়ার মাধ্যমে শরীরে চরম জলশূন্যতা (ডিহাইড্রেশন) তৈরি করে মৃত্যু ডেকে আনতে পারে।

অনেকের ধারণা আম খেলে বড়জোর সামান্য চুলকানি হতে পারে। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, আমের কারণে অত্যন্ত বিরল ও প্রাণঘাতী অ্যালার্জিক রিয়্যাকশন হতে পারে, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘তীব্র অতিসংবেদনশীলতা’ বলা হয়।
আম খাওয়ার মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে শরীরজুড়ে তীব্র অ্যালার্জিক রিয়্যাকশন শুরু হতে পারে। এতে গলা ও ঠোঁট ফুলে যাওয়া, তীব্র শ্বাসকষ্ট এবং রক্তচাপ হঠাৎ কমে গিয়ে মানুষ ‘অ্যানাফিল্যাক্টিক শকে’ মারা যেতে পারে।
দিল্লির বল্লভভাই প্যাটেল চেস্ট ইনস্টিটিউটের গবেষকদের মতে, আমের অ্যালার্জেন এতটাই শক্তিশালী যে এটি ক্যানড বা প্রসেসড (প্যাকেটজাত) জুস খাওয়ার পরও নষ্ট হয় না। এমনকি আমের কষ বা আম গাছের সংস্পর্শে এলেও অনেকের চামড়ায় মারাত্মক প্রদাহ দেখা দেয়।

খুলনার কয়রায় ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনার পেছনে ফুড পয়জনিং বা মারাত্মক ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আম যদি কোনো কারণে পচা, অতিরিক্ত নরম বা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া (যেমন: সালমোনেলা বা ই-কোলাই) দ্বারা আক্রান্ত হয়, তবে তা শরীরে মারাত্মক টক্সিন বা বিষ তৈরি করে।
আম খাওয়ার পর তীব্র ডায়রিয়া এবং বমি হলে শরীর থেকে দ্রুত পানি ও প্রয়োজনীয় ইলেক্ট্রোলাইট (লবণ) বের হয়ে যায়। সঠিক সময়ে স্যালাইন বা চিকিৎসা দেওয়া না হলে শক বা অর্গান ফেইলিউরের কারণে রোগীর মৃত্যু হতে পারে।
আম কেনার পর তা খাওয়ার আগে অন্তত আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা পরিষ্কার পানিতে ভিজিয়ে রাখুন। এতে আমে থাকা কীটনাশক বা কষ ভালোভাবে ধুয়ে যায়।
আমের বোঁটার অংশটি কিছুটা গভীরভাবে কেটে ফেলার পর পুরো আমটি আবার ভালো করে ধুয়ে নিন।
অতিরিক্ত নরম, পচা, দাগযুক্ত বা রাসায়নিকের অস্বাভাবিক গন্ধযুক্ত আম খাওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন।
আম খাওয়ার পর যদি শ্বাসকষ্ট, ঠোঁট-গলা ফোলা বা তীব্র পেটে ব্যথা ও ডায়রিয়া শুরু হয়, তবে এক মুহূর্তও দেরি না করে রোগীকে নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান।

