পারস্য উপসাগরের উত্তাল জলরাশিতে আটকা পড়েছে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের গর্ব ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’। সৌদি আরবের রাস আল খায়ের বন্দর থেকে ৩৭ হাজার টন সার নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার পথে রওনা হওয়া এই জাহাজটি এখন কেবল সমুদ্রের ঢেউ নয়, বরং ইরান-মার্কিন স্নায়ুযুদ্ধের এক অদৃশ্য শিকার।
তিন-তিনবার চেষ্টা করেও হরমুজ প্রণালী পার হতে না পারা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলে ফিরে আসা—ঘটনাটি যতটা না যান্ত্রিক, তার চেয়ে বেশি কৌশলগত।
১৭ এপ্রিল ইরান যখন হরমুজ খোলার ঘোষণা দেয়, তখন বিশ্বের অনেক দেশের জাহাজই লাইন দিয়েছিল। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন, বিপ্লব পরবর্তী ইরান সবসময়ই ‘রেসিপ্রোসিটি’ বা ‘পারস্পরিক বিনিময়ে’ বিশ্বাসী। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি অলিখিত নিয়ম হলো—সংকটের সময় যারা পাশে থাকে, সুবিধার সময় তারা আগে সুযোগ পায়।
হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ইরান এখন বিশ্বকে দেখাচ্ছে যে তারাই এই অঞ্চলের ট্রাফিক পুলিশ। আপনার ধারণাটি অত্যন্ত যৌক্তিক যে, ইরান শুরুতে তাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বা ‘ফ্রেন্ডলি’ দেশগুলোকে আগে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে। সাম্প্রতিক সংঘাতে বাংলাদেশের অবস্থান বা সরকারি বিবৃতি নিয়ে তেহরান যে কিছুটা অসন্তুষ্ট ছিল, তা কূটনৈতিক মহলে গোপন নয়। ফলে অগ্রাধিকার তালিকায় বাংলাদেশের জাহাজটি সিরিয়ালের পেছনের দিকে পড়ে যাওয়া মোটেও আশ্চর্যজনক নয়।
সোশ্যাল মিডিয়ায় চাউর হওয়া “বাংলাদেশের জন্য চিরতরে হরমুজ বন্ধ” বা “ইরান-বিরোধী অবস্থানের জন্য জাহাজ ছাড়ছে না”—এই কথাগুলো যে ভিত্তিহীন, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো এর আগেই বাংলাদেশের ৬টি জাহাজকে ইরান ছেড়ে দিয়েছে। ‘বাংলার জয়যাত্রা’ আটকা পড়ার মূল কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একগুঁয়েমি। আমেরিকা ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ তুলে না নেওয়ায় ইরানও ১৮ এপ্রিল থেকে পুনরায় কড়াকড়ি আরোপ করেছে। এটি মূলত একটি ‘বারগেইনিং চিপ’ বা দর কষাকষির হাতিয়ার।
৩১ জন বাংলাদেশি ক্রু নিয়ে জাহাজটি এখন শারজাহ বা মিনা সাকর এলাকায় অপেক্ষায় আছে। যদিও খাবার বা পানির সংকট নেই, কিন্তু ৪৮ দিনের এই অনিশ্চয়তা ক্রুদের মানসিক চাপ ও বাণিজ্যিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ সরকার কূটনৈতিক চ্যানেলে যোগাযোগ করছে, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের সিদ্ধান্ত পুরোপুরি নির্ভর করছে ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।
এই ঘটনাটি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় শিক্ষা। যখন বিশ্ব ‘ইউনিপোলার’ থেকে ‘মাল্টিপোলার’ অর্ডারের দিকে যায়, তখন মধ্যপ্রাচ্যের মতো স্পর্শকাতর ইস্যুতে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নেওয়া কতটা জরুরি, তা বাংলার জয়যাত্রার ইঞ্জিন বন্ধ হওয়া থেকেই বোঝা যায়। ইরান হয়তো আমাদের শত্রু নয়, কিন্তু তারা এটুকু বুঝিয়ে দিচ্ছে যে—তাদের কৌশলগত যুদ্ধে ‘বন্ধুত্বের’ পরীক্ষায় যারা উত্তীর্ণ হবে, হরমুজের ফটক তাদের জন্যই আগে খুলবে।
সবকিছু স্বাভাবিক হলে ‘বাংলার জয়যাত্রা’ অবশ্যই তার গন্তব্যে পৌঁছাবে, তবে সেই সিরিয়ালে আমাদের অবস্থানটি আমাদের পররাষ্ট্রনীতির সফলতারই প্রতিফলন ঘটাবে।

