গত মার্চে ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পর বাংলাদেশ জোরালো কোনো নিন্দা না জানানোয় অনেকেই সরকারের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন। সে সময় জনমনে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছিল যে, সরকার হয়তো জনগণের অনুভূতির প্রতি সুবিচার করতে পারেনি এবং এতে করে ইরানের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করছে, সেই শঙ্কা অনেকটাই অমূলক ছিল।
সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটি কূটনৈতিক দূরদর্শিতারই একটি অংশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের ইরান সফর দুই দেশের সম্পর্কে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা দিচ্ছে। তেহরানে পৌঁছানোর পর ইরানি ডেপুটি স্পিকার হামিদ রেজা হাজী বাবায়েই বাংলাদেশি প্রতিনিধি দলকে অত্যন্ত উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান।
পরবর্তীতে ইরানের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা ও পার্লামেন্ট স্পিকার বাঘের গালিবাফের সাথে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের একটি অত্যন্ত সফল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে ইসলামী রীতিতে তাদের আন্তরিক কোলাকুলি দুই দেশের উষ্ণ সম্পর্কেরই প্রমাণ দেয়। এ সময় গালিবাফকে বাংলাদেশ সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণও জানানো হয়েছে। এর আগে বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক ইরানি রাষ্ট্রদূত জালিলি রহিমি জাহানাবাদীও ইরান ইস্যুতে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের অবস্থানের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন।
অনেকের মনে শঙ্কা থাকতে পারে যে, ইরানের সাথে এই ঘনিষ্ঠতার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীদের কর্মসংস্থান হুমকিতে পড়বে কি না। বাস্তবিক অর্থে এই শঙ্কার তেমন কোনো ভিত্তি নেই। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে সস্তা ও দক্ষ শ্রমিকের যে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে, তার অন্যতম প্রধান জোগানদাতা বাংলাদেশ। ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন আর ইরানকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলার অবস্থানে নেই।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের সাথে সংঘাত থেকে ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তাই ইরানের সাথে বাংলাদেশের এই কৌশলগত সম্পর্ক উন্নয়নে ওয়াশিংটনেরও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখানোর কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর পর বাংলাদেশ ও ইরানের মধ্যে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এমন উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ স্থাপিত হলো। ঐতিহাসিকভাবেও ইরানের সাথে বাংলাদেশের গভীর সম্পর্ক রয়েছে; যার একটি বড় প্রমাণ হলো, বাংলাদেশের একমাত্র তেল শোধনাগার ‘ইস্টার্ন রিফাইনারি’, যা ইরানের সহায়তায়ই নির্মিত হয়েছিল।
সার্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায়, যারা বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছিলেন, তাদের জন্য এই কূটনৈতিক পদক্ষেপ একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং ইতিবাচক বার্তা বহন করে।

