জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম ঐতিহাসিক ও সিদ্ধান্তমূলক মোড় ছিল ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট। এদিন কোটা সংস্কার আন্দোলন পূর্ণাঙ্গ সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়। দেশজুড়ে তীব্র সংঘাত, প্রাণহানি ও অব্যাহত ধরপাকড়ের মধ্যে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার জন্য গণভবনের দরজা খোলা রাখার কথা বললেও সেই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। একই সঙ্গে তৎকালীন সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করা হয়।
সেদিন বিকেলে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত এক সুবিশাল গণসমাবেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ঐতিহাসিক এক দফা দাবি ঘোষণা করেন। লাখো মানুষের উপস্থিতিতে তিনি বলেন, “মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ও সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা এক দফা দাবির সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি। আমাদের এক দফা হলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ এই সরকারের পতন এবং ফ্যাসিবাদের বিলোপ।” সমাবেশ থেকে আন্দোলন চলাকালে ঘটে যাওয়া সব হত্যাকাণ্ড ও অপহরণের বিচার দাবি করা হয়।
এর আগে সকালে গণভবনে পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংঘাত এড়াতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসার ইচ্ছা প্রকাশ করে বলেন, “গণভবনের দরজা খোলা। আমি আন্দোলনরত ছাত্রদের সঙ্গে বসতে চাই।” কিন্তু আন্দোলনরত ছাত্র নেতারা তা নাকচ করে দেন।
সেদিন গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি উপেক্ষা করে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও এর আশপাশের এলাকা সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতিতে জনসমুদ্রে পরিণত হয়। ‘দফা এক, দাবি এক, শেখ হাসিনার পদত্যাগ’ ও ‘জাস্টিস, উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। সমাবেশ থেকে আন্দোলনের সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের অংশ হিসেবে ১৫ দফা নির্দেশনা ঘোষণা করেন। এর মধ্যে ট্যাক্স-খাজনা ও ইউটিলিটি বিল বর্জন, সব সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা এবং প্রবাসীদের ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানো বন্ধের আহ্বান অন্তর্ভুক্ত ছিল।
একই দিনে সেনাসদর দপ্তরে সেনা কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, “জনগণের স্বার্থে এবং রাষ্ট্রের যেকোনো প্রয়োজনে সেনাবাহিনী সব সময় জনগণের পাশে আছে এবং থাকবে।”
অন্যদিকে তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানোর অভিযোগ তোলেন এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দাবি করেন যে কোটা আন্দোলন রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে, যেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, পুলিশের গুলিতে কেউ মারা যায়নি। তবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সেদিনের ঘটনাপ্রবাহকে গণজাগরণ আখ্যা দিয়ে বলেন, আন্দোলন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে।
সেদিন বাড্ডা, রামপুরা, সায়েন্সল্যাব ও মিরপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্পটে দিনভর বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, গাজীপুর, বগুড়া, সিলেট ও নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটে। চট্টগ্রামে শিক্ষামন্ত্রীর বাসভবন ও আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে রাজপথে নামেন সংগীতশিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীরাও। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বিচারের আশ্বাসের জবাবে শিক্ষক ও অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ প্রশ্ন তুলেছিলেন, “হত্যাকারী কীভাবে নিজের বিচার করবে।”

