তিন বছর আগে ইসরায়েলি হামলায় গুঁড়িয়ে গিয়েছিল ঘরবাড়ি। হারিয়ে গিয়েছিলেন ঘরের সন্তান। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও যখন কোনো সন্ধান মেলেনি, তখন পরিবার ধরে নিয়েছিল—সেও বুঝি ভাইদের মতো পাড়ি জমিয়েছে না ফেরার দেশে। শোকাতুর পরিবার সামাজিক রীতি মেনে বাড়ির সামনে টানিয়েছিল শোকের তাঁবু। আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশীদের আপ্যায়ন করে সম্পন্ন হয়েছিল মৃত্যুর সব আনুষ্ঠানিকতা। কিন্তু দীর্ঘ তিন বছর পর সবাইকে স্তব্ধ ও আবেগাপ্লুত করে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে জীবন্ত ফিরে এলেন সেই ফিলিস্তিনি যুবক।
অবিশ্বাস্য এই ঘটনাটি ঘটেছে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার খান ইউনেস এলাকায়। যুবকের নাম আদহাম আল-বান্না।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তিন বছর আগে এক ভয়াবহ ইসরায়েলি হামলায় আদহামের তিন ভাই একসাথে শহিদ হন। সেই একই হামলায় নিখোঁজ হন আদহামও। দীর্ঘ সময় ধ্বংসস্তূপ কিংবা কোথাও তার কোনো খোঁজ না মেলায় পরিবারের সবাই নিশ্চিত হন যে, আদহামও শাহাদাত বরণ করেছেন। তার আত্মার মাগফেরাত কামনায় পরিবার সব ধরনের ধর্মীয় ও সামাজিক আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে।
তবে আদহামের লাশ খুঁজে না পাওয়ায় মনের ভেতর একটা গভীর ক্ষত আর সন্দেহ বয়ে বেড়াচ্ছিলেন তার হবু স্ত্রী। শেষ পর্যন্ত ভালোবাসার মানুষের লাশের শেষ পরিণতি জানতে এক চরম ত্যাগ স্বীকার করেন তিনি। নিজের বিয়ের সব স্বর্ণ-গহনা বিক্রি করে দিয়ে সেই টাকা দিয়ে একজন আইনজীবী নিয়োগ করেন তিনি। উদ্দেশ্য ছিল একটাই—ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আদহামের লাশের অবস্থান বা তাকে কোথায় কবর দেওয়া হয়েছে, তা খুঁজে বের করা।
সেই আইনজীবী দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ ও অনুসন্ধান চালানোর পর এক বিস্ময়কর তথ্য আবিষ্কার করেন। জানা যায়, আদহাম আসলে মারা যাননি, তিনি বেঁচে আছেন! সেদিনের সেই রক্তক্ষয়ী হামলার পর ইসরায়েলি সৈন্যরা তাকে গুরুতর আহত বা অচেতন অবস্থায় আটক করে নিয়ে গিয়েছিল। এরপর থেকে গত তিন বছর ধরে কোনো প্রকার বিচার বা অভিযোগ ছাড়াই ইসরায়েলের একটি অন্ধকার কারাগারে বন্দি ছিলেন তিনি। পরিবার বা বাইরের পৃথিবীর সাথে তার যোগাযোগের কোনো সুযোগ ছিল না।
অবশেষে চলতি সপ্তাহে ইসরায়েলি কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া একদল ফিলিস্তিনি বন্দির সাথে নিজ মাতৃভূমিতে, পরিবারের কোলে ফিরে এসেছেন আদহাম আল-বান্না।
যে বাড়িতে তিন বছর আগে তার মৃত্যুর শোক পালন করা হয়েছিল, আজ সেখানে বইছে আনন্দের অশ্রু। আদহামের ফিরে আসার খবর ছড়িয়ে পড়তেই পুরো এলাকায় এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। প্রতিবেশীরা বলছেন, এটি অলৌকিক ঘটনার চেয়ে কম কিছু নয়। আর আদহামের হবু স্ত্রীর এই অসামান্য ত্যাগ ও ভালোবাসার গল্প এখন গাজার মানুষের মুখে মুখে।

