মুহাম্মদ আল্-হেলাল
বছর ঘুরে আমাদের মাঝে হাজির হয়েছে রক্তাক্ত লাল জুলাই। ২০২৪ সালে যে জুলাই এদেশে এনেছিল বিপ্লব-গনঅভ্যুত্থান, ঝরেছিল রক্তের বন্যা, দেখেছিল জাতি লাশের স্তূপ আর লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার মতো জঘন্য কর্মকাণ্ড। বর্তমান সরকারের ২০২৬ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের সুযোগ পাওয়ায় জন আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল শিক্ষা এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাবেন যথাক্রমে শিক্ষাবিদ ড. আনম এহসানুল হক মিলন এবং লুৎফুজ্জামান বাবর।
কারন জনগণের দৃষ্টিতে তাদের পূর্বে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ে দায়িত্ব পালনে ভালো সফলতা রয়েছে। একটি মন্ত্রনালয়ের ধারণা সঠিক না হলেও আরেকটি হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে শিক্ষাবিদ ড. আনম এহসানুল হক মিলন আরেক শিক্ষাবিদ ববি হাজ্জাজকে পেয়েছেন রানিংমেট অর্থাৎ প্রতিমন্ত্রী হিসাবে এযেন সোনায় সোহাগা।
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর শিক্ষা মন্ত্রনালয় ইতিবাচকভাবে যতোটা মিডিয়ায় স্থান পেয়েছে আর বোধ হয় কোন মন্ত্রনালয় এতটা পায়নি। দুই শিক্ষাবিদের শিক্ষামন্ত্রি হওয়ার কারণেই বোধহয় শিক্ষা নিয়ে এতটা জন আকাঙ্ক্ষা এবং আলোচনা। এই সরকারের অল্প দিনে শিক্ষাখাতে বেশ কিছু সংস্কার হয়েছে এবং বিপ্লব-প্রতিবিপ্লব প্রতিহত ও এক জাতি গঠনে আরেকটি সংস্কারও জরুরি। কারন বিপ্লব প্রতিবিপ্লব মানেই রক্ত, লাশ, হত্যা রাহাজানি ইত্যাদি।
এইচ বি আর আলিম মাদ্রাসা এবং ২৬ নং ডিবি রঘুনাথপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলায় একই আঙ্গিনায় দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। প্রাথমিক বিদ্যালয়টিতে নিয়মতান্ত্রিক ভাবে শিশু শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি আর মাদ্রাসাটিতে প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হয়। এ ধরনের আরো অসংখ্য মাদ্রাসা এ দেশে রয়েছে যেখানে স্নাতক, স্নাতকোত্তর শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হয়।
প্রতিষ্ঠান দুটিতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অনুষ্ঠান হয়, খেলাধুলা হয়, টিফিনের সময়ও প্রায় একই সাথে হয় কিন্তু প্রতিষ্ঠান দুটির শিক্ষার্থীদের একসাথে খেলাধুলা, টিফিন বা কোন অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করতে দেখা যায় না। এমনকি শিক্ষক-শিক্ষয়ত্রীদেরকেও একই সাথে কোন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে দেখা যায় না। মনে হয় প্রতিষ্ঠান দুটির মধ্যে সাপে-নেউলে সম্পর্ক। অথচ দুটি প্রতিষ্ঠানই গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে চলে। একই পরিবারের সদস্যরাও এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত থাকে যেটির দৃষ্টান্ত এই প্রতিষ্ঠান দুটিতেও রয়েছে। প্রতিষ্ঠান দুটির শিক্ষার্থীদের পাঠ্যক্রমের সাথে ইউনিফর্মের মধ্যেও রয়েছে বিস্তর পার্থক্য।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ইউনিফর্ম ছেলেদের হাফ শার্ট, হাফ প্যান্ট আর মেয়েদের হাফপ্যান্ট এবং ফ্রক। অন্যদিকে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের প্রথম শ্রেণি থেকেই ইউনিফর্ম ছেলেদের পাঞ্জাবি, পায়জামা আর টুপি। আর মেয়েদের প্রথম শ্রেণি থেকেই বুরকা, হিজাব ইসলামি শরিয়তের ফরজ পর্দা মেনে চলতে হয়। এটি দেশের ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থী, শিক্ষক-শিক্ষয়ত্রী এবং জনগণের মধ্যে বিভেদের দেওয়াল তৈরি হওয়ার একটি সাধারণ চিত্র যেমন তেমন পোশাক পরিচ্ছদের বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা যে বিধান দিয়েছেন তার লঙ্ঘন।
وَ قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنٰتِ یَغۡضُضۡنَ مِنۡ اَبۡصَارِهِنَّ وَ یَحۡفَظۡنَ فُرُوۡجَهُنَّ وَ لَا یُبۡدِیۡنَ زِیۡنَتَهُنَّ اِلَّا مَا ظَهَرَ مِنۡهَا وَ لۡیَضۡرِبۡنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلٰی جُیُوۡبِهِنَّ ۪ وَ لَا یُبۡدِیۡنَ زِیۡنَتَهُنَّ اِلَّا لِبُعُوۡلَتِهِنَّ اَوۡ اٰبَآئِهِنَّ اَوۡ اٰبَآءِ بُعُوۡلَتِهِنَّ اَوۡ اَبۡنَآئِهِنَّ اَوۡ اَبۡنَآءِ بُعُوۡلَتِهِنَّ اَوۡ اِخۡوَانِهِنَّ اَوۡ بَنِیۡۤ اِخۡوَانِهِنَّ اَوۡ بَنِیۡۤ اَخَوٰتِهِنَّ اَوۡ نِسَآئِهِنَّ اَوۡ مَا مَلَكَتۡ اَیۡمَانُهُنَّ اَوِ التّٰبِعِیۡنَ غَیۡرِ اُولِی الۡاِرۡبَۃِ مِنَ الرِّجَالِ اَوِ الطِّفۡلِ الَّذِیۡنَ لَمۡ یَظۡهَرُوۡا عَلٰی عَوۡرٰتِ النِّسَآءِ ۪ وَ لَا یَضۡرِبۡنَ بِاَرۡجُلِهِنَّ لِیُعۡلَمَ مَا یُخۡفِیۡنَ مِنۡ زِیۡنَتِهِنَّ ؕ وَ تُوۡبُوۡۤا اِلَی اللّٰهِ جَمِیۡعًا اَیُّهَ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ لَعَلَّكُمۡ تُفۡلِحُوۡنَ ﴿۳۱﴾
আর মুমিন নারীদেরকে বল, যেন তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে। আর যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য তারা প্রকাশ করবে না। তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে। আর তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, নিজেদের ছেলে, স্বামীর ছেলে, ভাই, ভাই এর ছেলে, বোনের ছেলে, আপন নারীগণ, তাদের ডান হাত যার মালিক হয়েছে, অধীনস্থ যৌন কামনামুক্ত পুরুষ অথবা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ বালক ছাড়া কারো কাছে নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। আর তারা যেন নিজেদের গোপন সৌন্দর্য প্রকাশ করার জন্য সজোরে পদচারণা না করে। হে মুমিনগণ, তোমরা সকলেই আল্লাহর নিকট তাওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। আন-নূর, আয়াত-৩১
উসাম এবং মারিয়া দুই ভাই বোন। উসাম এর বয়স ১০/১২ বছর সে হিফজ মাদ্রাসায় পড়ে, ইসলামি বিধি বিধান মেনে চলার পাশাপাশি আরবীয় আলখিল্লা পোশাক পরিধান করে। উসামের বোন মারিয়া কলেজে পড়ে। সে পশ্চিমাদের ন্যায় জিন্স প্যান্ট, টিশার্ট পরতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। একই পরিবারের দুই ভাই বোন হলেও তাদের মধ্যে পাঠ্যক্রম, পোশাক পরিচ্ছদ থেকে আদর্শগত পার্থক্য পর্যবেক্ষণ করলে মনে হয় দুই মেরুর দুই বাসিন্দা। এটি দেশের বিরাজমান শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে পরিবার থেকে বিভেদের দেওয়াল তৈরি হয় যেভাবে তার একটি উদাহরণ মাত্র।
নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণি, স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর শ্রেণীর পাঠদান করা হয় একজন অধ্যক্ষের অধীনে কিন্তু কলেজটি পরিচালিত হয় মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, যশোর এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বারা। কখনো কখনো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন কলেজের অধ্যক্ষদের সমন্বয়ে জরুরি মিটিং করার প্রয়োজন হতে পারে আবার একই সময়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের প্রয়োজন হতে পারে জরুরি মিটিং করার তখন উপরিউক্ত ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষদের উভয় মিটিং এ অংশগ্রহণ করা অসম্ভব আবার মিটিং এ অনুপস্থিত থাকার ক্ষতি শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য অনিবার্য হয়ে যায়। এটি দেশের শিক্ষা অব্যবস্থাপনার একটি ধারণা মাত্র।
এছাড়াও আমাদের দেশে আরেক ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান লক্ষণীয় সেটির নাম হলো বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ। বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজ দুটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান অথচ একই প্রতিষ্ঠানে দুটি নাম জুড়ে দেওয়া হয়েছে এমন অহরহ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সচেতন হওয়াই যথেষ্ট।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক মতপার্থক্য আছে, ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দল থাকতে পারে এটি স্বাভাবিক তবে জাতীয় কোন বিষয়ে ভিন্নমতের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় না যেটি এদেশে অহরহ। তবে এগুলো এ দেশের নানান ধরনের বিভেদের শিক্ষা ব্যবস্থার ফলে হচ্ছে তা আর বলার অবকাশ রাখে না।
১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের মধ্যে তেমন কোন বিভেদ পরিলক্ষিত না হলেও ১৯৫২ সালে ভাষা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির পর থেকে মতভেদ পরিলক্ষিত হতে থাকে (তথ্য সূত্রঃ ভাষা আন্দোলন: দাক্কা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়; মহিয়শী)। এই ভুল বোঝাবুঝির পর এ দেশে একটি কংক্রিটের স্থাপনা নির্মাণ করা হয় যেটির নাম দেওয়া হয় শহিদ মিনার। প্রতি বছর ২১ শে ফেব্রুয়ারি/৮ ই ফাল্গুন ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে নিহত কিছু মুসলিম ব্যক্তির স্মরণে ফুল দেওয়া হয় যেটি ইসলামি রীতি পরিপন্থি অর্থাৎ মুসলিম দেশে অন্য ধর্ম-সংস্কৃতির অনুকরণ যেটি আল্লাহ নিষিদ্ধ করেছেন
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَتَّخِذُوا الۡیَهُوۡدَ وَ النَّصٰرٰۤی اَوۡلِیَآءَ ۘؔ بَعۡضُهُمۡ اَوۡلِیَآءُ بَعۡضٍ ؕ وَ مَنۡ یَّتَوَلَّهُمۡ مِّنۡكُمۡ فَاِنَّهٗ مِنۡهُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰهَ لَا یَهۡدِی الۡقَوۡمَ الظّٰلِمِیۡنَ ﴿۵۱﴾
হে মুমিনগণ, ইহুদি ও নাসারাদেরকে তোমরা বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। আর তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে নিশ্চয় তাদেরই একজন। নিশ্চয় আল্লাহ জালিম কওমকে হেদায়াত দেন না। আল-মায়েদা, আয়াত-৫১
এই ভাষা আন্দোলনের পক্ষে বিপক্ষে জাতির মধ্যে বিভেদ ছিল এখনও আছে। একটি পক্ষের মতামত মুসলিমদের ভাষা হবে মুসলিম দেশের ভাষার মতো যেমন আরবি বা উর্ধ(উর্দু নয়) ভাষা গঠিত আরবি ভাষার ২৯টি অক্ষরের সাথে ৭টি নতুন অক্ষর যোগ করে। কিন্তু বাংলা ভাষার অক্ষর তো দেখতে হিন্দি ভাষায় ব্যবহৃত অক্ষরের মতো। রবীন্দ্রনাথ রচিত সোনার বাংলা কে জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে গ্রহণ করার বা গাওয়ার ক্ষেত্রেও এ দেশের মানুষের মধ্যে রয়েছে মতপার্থক্য। ইতোমধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ধারণার প্রবর্তক গোলাম আযম পুত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমান আযমী এক সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় সঙ্গীত পরিবর্তনের দাবি তুলেছেন তবে কোনটি জাতীয় সঙ্গীত হবে সে বিষয়ে তিনি কোন ইঙ্গিত দেননি।
এদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বা রাস্তায় ভাস্কর্যের নামে যে মূর্তি তৈরি করে জনগণের অর্থের অপচয় করা হয়েছে সেটিও এ দেশের ৯৫ ভাগ মুসলিমরা মেনে নিতে পারে না কেননা এটিও ইসলামি রীতি পরিপন্থি। এই মূর্তি বিষয়েও আল্লাহর কড়া সতর্কতা রয়েছে
رَبِّ اِنَّهُنَّ اَضۡلَلۡنَ كَثِیۡرًا مِّنَ النَّاسِ ۚ فَمَنۡ تَبِعَنِیۡ فَاِنَّهٗ مِنِّیۡ ۚ وَ مَنۡ عَصَانِیۡ فَاِنَّكَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ ﴿۳۶﴾
‘হে আমার রব, নিশ্চয় এসব মূর্তি অনেক মানুষকে পথভ্রষ্ট করেছে, সুতরাং যে আমার অনুসরণ করেছে, নিশ্চয় সে আমার দলভুক্ত, আর যে আমার অবাধ্য হয়েছে, তবে নিশ্চয় আপনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’। -সূরা ইবরাহীম, আয়াত-৩৬
অথচ সেই অর্থ দিয়ে কলকারখানা স্থাপন করলে এ দেশ থেকে বেকারত্বের মতো অভিশাপ নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত।
শহরগুলোকে বিকেন্দ্রীকরণের পরিবর্তে ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল তৈরির নামে বরং এক কেন্দ্রীকরণ করতঃ জনগণের টাকার তছরুপ করে শহর এবং গ্রামের জনগণের মধ্যে বিভেদ তৈরি করেছে। এই বিভেদের শিক্ষার ফলস্বরূপ জাতিকে দেখতে হয়েছে রক্তপাত, হতাহতের অসংখ্য আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, সেনা অভ্যুত্থান, ছাত্র-জনতার উত্থান মোকাবেলা করতে হয়েছে পরতে পরতে সংকট যেটি বর্তমানেও চলমান। নানামুখী শিক্ষা ব্যবস্থাই এক জাতি গঠন তথা জাতীয় ঐক্যমতে পৌঁছাতে বাঁধা বিপত্তি হিসেবে কাজ করে। ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেন
وَ اعۡتَصِمُوۡا بِحَبۡلِ اللّٰهِ جَمِیۡعًا وَّ لَا تَفَرَّقُوۡا ۪ وَ اذۡكُرُوۡا نِعۡمَتَ اللّٰهِ عَلَیۡكُمۡ اِذۡ كُنۡتُمۡ اَعۡدَآءً فَاَلَّفَ بَیۡنَ قُلُوۡبِكُمۡ فَاَصۡبَحۡتُمۡ بِنِعۡمَتِهٖۤ اِخۡوَانًا ۚ وَ كُنۡتُمۡ عَلٰی شَفَا حُفۡرَۃٍ مِّنَ النَّارِ فَاَنۡقَذَكُمۡ مِّنۡهَا ؕ كَذٰلِكَ یُبَیِّنُ اللّٰهُ لَكُمۡ اٰیٰتِهٖ لَعَلَّكُمۡ تَهۡتَدُوۡنَ ﴿۱۰۳﴾
আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং বিভক্ত হয়ো না। আর তোমরা তোমাদের উপর আল্লাহর নিয়ামতকে স্মরণ কর, যখন তোমরা পরস্পরে শত্রু ছিলে। তারপর আল্লাহ তোমাদের অন্তরে ভালোবাসার সঞ্চার করেছেন। অতঃপর তাঁর অনুগ্রহে তোমরা ভাই-ভাই হয়ে গেল। আর তোমরা ছিলে আগুনের গর্তের কিনারায়, অতঃপর তিনি তোমাদেরকে তা থেকে রক্ষা করেছেন। এভাবেই আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ বয়ান করেন, যাতে তোমরা হেদায়াত প্রাপ্ত হও। আলে-ইমরান, আয়াত-১০৩
১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের মৃত্যুবরণ করা মুসলিম ব্যক্তিদেরকে ইসলামি রীতি পরিপন্থি ফুল দিয়ে স্বরন করা পরিলক্ষিত হয়। ১৯৭১ সালেও এ দেশের এক বিশাল জনগোষ্ঠী পাকিস্তান বিভক্তির বিরুদ্ধে ছিল ভারতীয় আধিপত্যের আশঙ্কা এবং ইসলামি আন্দোলনের স্বার্থকে কেন্দ্র করে যেমনভাবে ১৯৪৭ সালের ভারত-পাকিস্তান বিভক্তিরও বিরোধিতা করেছিল। এ সকল ক্ষেত্রে অখণ্ড এবং শক্তিশালী এক মাতৃভূমি দেখতে চাওয়ার বিষয় কাজ করেছিল।
১৯৭১ সালের পর এ দেশের রাষ্ট্রপতি হন শেখ মুজিবুর রহমান তাকে সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ১৯৭৫ সালে হত্যা করতে হলো আবার ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কেও হত্যা করা হলো। ৭ই নভেম্বর কে এ দেশের এক শ্রেণির মানুষ জাতীয় সংহতি দিবস আরেক শ্রেণীর মানুষ কালো দিবস পালন করে। হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ কেও আবার গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হলো ১৯৯০ সালে একই ভাবে ১৯৯৬ সালে বেগম খালেদা জিয়া কে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য করা হয়।
সর্বশেষ ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে রাজপথে ১৯৯০ সালের মতো জামায়াত-বিএনপি ৩রা আগস্ট ২০২৪ অসহযোগ আন্দোলন ও শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগের ১ দফা দাবিতে অগ্নি স্ফুলিঙ্গের মতো যোগদান করলে আন্দোলন তীব্রতর হয়ে ওঠে। প্রায় ৭২ ঘণ্টার মধ্যে জাতির বিশাল রক্তপাত, হত্যা-রাহাজানি, লাশের স্তূপ, লাশ পুড়ানোর মতো জঘন্য কর্মকাণ্ড ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে জামায়াতের বিরুদ্ধে প্রজ্ঞাপন জারি করা আওয়ামী লীগেরই পতন নিশ্চিত হয় এবং নিবন্ধন বাতিলের মাধ্যমে আওয়ামী লীগেরই এদেশে রাজনীতি করার অধিকার চিরদিনের জন্য হাতছাড়া হয়।
৫ই আগস্ট ২০২৪ আওয়ামী সরকারের পতনের পর বিচারবিভাগীয় ক্যু, পুলিশ, আনসার বাহিনী, স্বাস্থ্য বিভাগ, পল্লীবিদ্যুৎ, পোশাক শিল্প ইত্যাদির মাধ্যমে ক্যু বা প্রতিবিপ্লব করার চেষ্টা করা হয় তবে ছাত্র-জনতার বাঁধার মুখে সেগুলো পণ্ড হয়ে যায়। এগুলো সবই নানামুখী শিক্ষা(পথ) নানা মতের কারণে আদর্শগত বিভেদের ফল।
জাতিসংঘ সংজ্ঞা মোতাবেক মানুষ ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত শিশু। শিশু থাকাকালীন মানুষের শারীরিক গঠনের সাথে শিক্ষা, পারিপার্শ্বিক পরিবেশ ইত্যাদির মাধ্যমে মনোজগতের গঠন বা পরিবর্তন হয়। উদাহরণ হিসাবে বলা আজ থেকে ২ দশক আগে এ দেশের তরুণরা দাড়ি রাখতে লজ্জা পেত এখন না রাখলে লজ্জা পায়। আবার ১ দশক আগে আমাদের দেশের কৃষকরা যে জমিতে ধান চাষ করতেন সেখানে শামা ঘাস হলে সেগুলো আগাছা হিসাবে তুলে ফেলতেন এখন সেই কৃষকই সেই জমিতে শামা ঘাসের চাষ করেন তার মধ্যে ধান হলে আগাছা হিসাবে তুলে ফেলেন। এসবই শিক্ষা এবং পারিপার্শ্বিক পরিবর্তনের ফল। শিশু বয়সে মানুষের মধ্যে যে শিক্ষা কাঠামো গঠন হয় তৃতীয় পর্যায়ের স্নাতক পর্যায়ে সেটির বিস্তার ঘটে। শিশু বয়সেই এক জাতি গঠন করার প্রয়াস গ্রহণ পরিহার্য।
এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে তার মধ্যে একটি হলো হিফ্জ শিক্ষা ব্যবস্থা যেখানে শুধু পবিত্র কুরান মুখস্থ করানো হয় অন্য কোন গবেষণা করা হয় না। অন্যদিকে কওমি মাদ্রাসা রয়েছে যেখানে পরকাল ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ দুটি শিক্ষায় শিক্ষিত লোকেরা যত্রতত্র মাদ্রাসা বা মসজিদ প্রতিষ্ঠা করে জনগণের নিকট থেকে অর্থ, চাউল ইত্যাদি সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করে। জাতির বিশাল অংশ তাদের মানুষের নিকট হাত পাতাকে পছন্দ করে না। এটিও ইসলামি রীতি পরিপন্থি কাজ এবং জাতির বিভেদ তৈরিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। অথচ আল্লাহ তায়ালা সালাত আদায় শেষে শেষ হলেই দুনিয়ার কাজে জন্য ছড়িয়ে পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন
فَاِذَا قُضِیَتِ الصَّلٰوۃُ فَانۡتَشِرُوۡا فِی الۡاَرۡضِ وَ ابۡتَغُوۡا مِنۡ فَضۡلِ اللّٰهِ وَ اذۡكُرُوا اللّٰهَ كَثِیۡرًا لَّعَلَّكُمۡ تُفۡلِحُوۡنَ ﴿۱۰﴾
অতঃপর যখন সালাত সমাপ্ত হবে তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় আর আল্লাহর অনুগ্রহ হতে অনুসন্ধান কর এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ কর, যাতে তোমরা সফল হতে পার। আল-জুমু’আ, আয়াত-১০
দেশে যে শিক্ষা ব্যবস্থা বিদ্যমান তার মধ্যে সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থা ধরা হয় স্কুল কলেজের শিক্ষা ব্যবস্থা কে যেখানে শুধু জাগতিক বিষয়ে তথা ইংরেজি সাহিত্য, বাংলা সাহিত্য, গণিত, পৌরনীতি, অর্থনীতি, সমাজ বিজ্ঞান, পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, উচ্চতর গণিত, হিসাব বিজ্ঞান, বিপণন ইত্যাদি শিক্ষা প্রদান করা হয়। এ ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থায় আবার ধর্মীয় শিক্ষার সুযোগ একেবারেই অনুপস্থিত প্রায়। যদিও পবিত্র সৃষ্টিকর্তার নামে অধ্যায়ে করার নির্দেশও এসেছে
اِقۡرَاۡ بِاسۡمِ رَبِّكَ الَّذِیۡ خَلَقَ ۚ﴿۱﴾
পড় তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। আল-আলাক, আয়াত-১
এছাড়া আছে আলিয়া মাদ্রাসা যেখানে জাগতিক এবং পরলৌকিক উভয় শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এখানে পাঠ্যক্রমের মধ্যে অন্যতম কুরান, হাদিস, আরবি সাহিত্য, ইংরেজি সাহিত্য, বাংলা সাহিত্য, গণিত, ফিকহ(ইসলামি আইন শাস্ত্র), মানতিক-বালাগাত(ইসলামি যুক্তিবিদ্যা), পৌরনীতি, অর্থনীতি, সমাজ বিজ্ঞান, পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, উচ্চতর গণিত ইত্যাদি সুতরাং এখানে সাধারণ এবং মুসলিম জাতির প্রয়োজনীয় সকল বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হয়। এসব প্রতিষ্ঠানেও সরকারি নিয়মানুযায়ী রবীন্দ্রনাথের রচিত আমার সোনার বাংলা গান গাওয়ার জন্য বাধ্য করা হলেও তাদের একটি বৃহৎ অংশ মন থেকে সেটি সমর্থন করতে পারে না। ফলে ক্ষোভের পুঞ্জীভূত হতে দেখা যায় তাদের মধ্যে।
এক জাতি গঠনে আলিয়া, কওমি, হিফজ, স্কুল, কলেজ ইত্যাদি যত ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা আছে সকল শিক্ষা ব্যবস্থার সমন্বয়ে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত এক ও অভিন্ন শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন করা এখন অত্যন্ত জরুরি। এটি যে কোন এক নামে যেমন মাদ্রাসা, বিদ্যালয় বা স্কুল নামে প্রবর্তন করতে হবে। তৃতীয় বা স্নাতক পর্যায়ে থাকবে শুধু বিশ্ববিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান সেখান থেকে যে কোন শিক্ষার্থীর জন্য অনুমোদিত যেকোনো বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ অবারিত থাকবে।
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ছাড়াও বিভিন্ন ধর্মের লোকদের বসবাসের এক বৈচিত্র্যময় ভূমি এদেশ। বৈচিত্র্যকে বিবেচনা করে শুধুমাত্র ধর্মীয় ও বিভাগীয় বিষয়সমূহ পৃথক হবে এবং পৃথক বিষয়সমূহ পাঠদানের সময় ভিন্ন ভিন্ন কক্ষে হওয়া ছাড়া দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত আর কোন বিভেদ রাখা কাম্য নয়।
অদূর ভবিষ্যতে সেনা অভ্যুত্থান, গণ অভ্যুত্থান, ছাত্র-জনতার বিপ্লব বা প্রতিবিপ্লব, জাতীয় বিষয়ে মতানৈক্য, রক্তপাতের মাধ্যমে বিধবা, সধভা, ইয়াতীম, সন্তান হারা মা-বাবা হওয়ার পথ অবরুদ্ধ করতে এবং এক জাতি গঠনে হিফজ, আলিয়া, কওমী, স্কুল কলেজ এর সমন্বয়ে কমপক্ষে উচ্চ মাধ্যমিক তথা দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত এক ও অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা এখন সময়ের দাবি।
কলামিস্ট ও এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

