মীর ইমরান, মাদারীপুর প্রতিনিধি:
দেশে দক্ষ নার্সের ঘাটতি পূরণ এবং স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে মাদারীপুরের শিবচরে নির্মাণাধীন আধুনিক নার্সিং কলেজ প্রকল্পটি এখন অনিশ্চয়তার মুখে। ৩৩ কোটি ২৫ লাখ ৪৬ হাজার টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পের ৮৮ শতাংশ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে প্রায় ২৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা বিল উত্তোলনের পর অসমাপ্ত অবস্থায় নির্মাণকাজ ফেলে চলে যায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
ফলে প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ রয়েছে নির্মাণকাজ। যে ক্যাম্পাসে ভবিষ্যতে দক্ষ নার্স তৈরির স্বপ্ন বাস্তবায়িত হওয়ার কথা ছিল, সেই ভবন এখন মাদকসেবী ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের নিরাপদ আস্তানায় পরিণত হয়েছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পুরো প্রকল্প এলাকা আগাছা, লতাপাতা ও ঝোপঝাড়ে ঢেকে গেছে। নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন কক্ষে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে মাদক সেবনের সরঞ্জাম, ভাঙা বোতল, ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, সিগারেট ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের অবশিষ্টাংশ। ভবনের ভেতরে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে রয়েছে।
নিরাপত্তাকর্মী বা তদারকির কোনো ব্যবস্থা না থাকায় দিনের বেলায়ও ভবনটি নির্জন থাকে। সন্ধ্যার পর এলাকাটি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এখানে নিয়মিত মাদকসেবীদের আড্ডা, চুরি, ভাঙচুর এবং বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন অরক্ষিত থাকায় ভবনের বিভিন্ন কক্ষ থেকে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, জানালা-দরজার ফিটিংসসহ মূল্যবান নির্মাণসামগ্রীও চুরি হয়ে গেছে।
স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, শিবচর উপজেলার বড় বাহাদুরপুর ও বড়দোয়ালী মৌজায় ২০২১ সালের ১০ মার্চ প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। চুক্তি অনুযায়ী ২০২৪ সালের ২০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল।
রাজধানীর মিরপুরের পূর্ব শেওড়াপাড়াভিত্তিক মেসার্স এমএনএইচসিএল ও এইচএমএইচই নামে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে নির্মাণকাজের দায়িত্ব পায়। প্রকল্পের অগ্রগতি ৮৮ শতাংশ দেখিয়ে প্রতিষ্ঠান দুটিকে প্রায় ২৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ অসমাপ্ত রেখেই সরে যায়। পরে কাজে বিলম্ব ও চুক্তির শর্ত ভঙ্গের অভিযোগে প্রতিষ্ঠান দুটির কার্যক্রম বাতিল করে নতুন করে দরপত্র আহ্বানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. আলমগীর হাসান বলেন,আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই ভবনটির নির্মাণকাজ বন্ধ। দীর্ঘদিন ধরে কোনো শ্রমিক বা কর্মকর্তা এখানে আসেন না। অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকায় এটি এখন এলাকার বখাটে ও মাদকসেবীদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে।”
আরেক বাসিন্দা সাব্বির হোসেন বলেন,দিনের বেলায়ও ভবনটি নির্জন থাকে, আর সন্ধ্যার পর সাধারণ মানুষ এখানে আসতে ভয় পান। নিরাপত্তার অভাবে নানা ধরনের অসামাজিক কর্মকাণ্ড চলছে। সরকারের কাছে আমাদের দাবি, দ্রুত কাজ শেষ করে কলেজটি চালু করা হোক।”
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) শিবচর উপজেলা শাখার সভাপতি আবুল খায়ের খান বলেন,দেশে দক্ষ নার্সের চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। অথচ এত বড় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বছরের পর বছর অসমাপ্ত পড়ে রয়েছে। দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করে কলেজটি চালু করা গেলে দক্ষ নার্স তৈরি হবে, স্বাস্থ্যখাতে জনবল সংকট কমবে এবং সাধারণ মানুষ উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পাবে।
মাদারীপুর স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবীব বলেন,অসমাপ্ত কাজ দ্রুত শেষ করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে এবং আগের দরপত্র বাতিল করা হয়েছে। খুব শিগগিরই নতুন দরপত্র আহ্বান করে অবশিষ্ট নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা হবে।
স্বাস্থ্যসেবা খাতে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে নার্সিং কলেজের গুরুত্ব অপরিসীম। অথচ কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে অচল থাকায় একদিকে যেমন সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহার প্রশ্নের মুখে পড়েছে, অন্যদিকে জনগণও প্রত্যাশিত স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, নির্মাণাধীন ভবনে দ্রুত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, চুরি-ভাঙচুর ও মাদকসেবীদের দৌরাত্ম্য বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়ানো এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে অবশিষ্ট নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করে মাদারীপুর নার্সিং কলেজ চালু করা এখন সময়ের দাবি।

