চীনের তিব্বত অঞ্চলে ইয়ারলুং সাংপো (ভারতে ব্রহ্মপুত্র) নদীর ওপর নির্মাণাধীন বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক এক ভূতাত্ত্বিক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, বিশাল এই বাঁধের নিচ দিয়ে একটি সক্রিয় ভূগর্ভস্থ ফল্ট লাইন বা চ্যুতি অতিক্রম করেছে, যা ভবিষ্যতে প্রকল্পটির নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
হংকংভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট জানায়, চীনের রাষ্ট্রীয় সংস্থা চায়না জিওলজিক্যাল সার্ভে-এর তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত Sedimentary Geology and Tethyan Geology সাময়িকীতে এই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। এতে চেংদু ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি, চায়না জিওলজিক্যাল সার্ভে এবং ইয়ারলুং সাংপো নদী গবেষণা কেন্দ্রের একদল ভূতাত্ত্বিক অংশ নেন।
গবেষণায় বলা হয়েছে, বাঁধ নির্মাণস্থলের নিচে থাকা ‘পাইঝেন ফল্ট’ বহু হাজার বছর ধরে সক্রিয় রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ফল্ট লাইন ভূমিকম্প, ভূমিধস এবং মাটির অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর প্রভাব শুধু বাঁধ নয়, প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সড়ক, সেতু, টানেল ও অন্যান্য অবকাঠামোর ওপরও পড়তে পারে।
গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ার কারণে ওই অঞ্চলের শিলাস্তর দুর্বল হয়ে গেছে। ফলে ৬০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং জলাধারে সঞ্চিত বিপুল পরিমাণ পানির চাপ ভবিষ্যতে ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, তিব্বতের পাহাড়ি এলাকার মাটি তুলনামূলকভাবে আলগা এবং দুর্বল। জলাধারে পানি সংরক্ষণ শুরু হলে দীর্ঘমেয়াদি পানির চাপ, ফল্ট লাইনের কম্পন এবং সম্ভাব্য ভূমিকম্প মিলিয়ে বড় ধরনের ভূমিধসের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। এতে বাঁধের কাঠামো এবং সেখানে কর্মরত মানুষের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
গত বছর তিব্বতে এই মেগা প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এর বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বছরে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা, যা বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ থ্রি গর্জেস বাঁধের উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় তিন গুণ।
ইয়ারলুং সাংপো নদী তিব্বত থেকে ভারতের অরুণাচল প্রদেশ ও আসামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে যমুনা নামে প্রবেশ করেছে। ফলে এই প্রকল্পে বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তার প্রভাব ভাটির দেশ ভারত ও বাংলাদেশের ওপরও পড়তে পারে বলে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা।
গবেষকরা জানান, বাঁধটি যে এলাকায় নির্মিত হচ্ছে সেটি হিমালয় সিসমিক বেল্ট বা ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। এ অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই শক্তিশালী ভূমিকম্পের জন্য পরিচিত এবং টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষের কারণে এখানে নিয়মিত ভূকম্পন ঘটে।
ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পাইঝেন ফল্ট প্লাইস্টোসিন যুগে সৃষ্টি হলেও বর্তমান হলোসিন যুগেও এর সক্রিয়তা অব্যাহত রয়েছে। প্রাচীন হ্রদের তলদেশের নমুনার কার্বন বিশ্লেষণেও প্রায় ৯ হাজার ৫০০ বছর আগে পর্যন্ত এই ফল্ট সক্রিয় থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
গবেষণায় ২০১৭ সালে তিব্বতের মিলিন এলাকায় সংঘটিত ৬ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্পের উদাহরণও তুলে ধরা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, ভবিষ্যতে মাঝারি বা বড় মাত্রার ভূমিকম্প ঘটলে তা ভূমিধস ও অবকাঠামোগত ক্ষতির ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তাই এই মেগা প্রকল্পের ভূতাত্ত্বিক নিরাপত্তা নিয়ে আরও বিস্তৃত মূল্যায়ন ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। কারণ, সম্ভাব্য কোনো বড় দুর্যোগ শুধু বাঁধের জন্য নয়, বরং পুরো ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার নিম্নাঞ্চলের দেশগুলোর জন্যও গুরুতর প্রভাব বয়ে আনতে পারে।

