২০২৪ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক চাঞ্চল্যকর ঘোষণা দিয়েছেন। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই দলের শীর্ষ নেতাদের সাথে নিয়ে তিনি দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করার পরিকল্পনা করছেন। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে (Reuters) দেওয়া এক বিশেষ ও একান্ত টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই এই দাবি করেছেন।
মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ার পর এই প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সরাসরি সাক্ষাৎকার দিলেন ৭৮ বছর বয়সী সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী।
‘গ্রেপ্তার বা মৃত্যু হলেও নিজের মাটিতেই মরতে চাই’
বৃহস্পতিবার গভীর রাতে শুরু হয়ে শুক্রবার পর্যন্ত চলা প্রায় ঘণ্টাব্যাপী এক আবেগঘন টেলিফোন সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, “দেশে ফেরার পর ওরা আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে, এমনকি মেরেও ফেলতে পারে। তবু আমাকে যেতেই হবে। আমার দলের নেতাকর্মীদের ওপর চরম দমন-পীড়ন চলছে। যদি মৃত্যুও আসে, আমি চাই সেটা আমার নিজের মাটিতেই হোক—যে মাটিতে আমার বাবা-মা শায়িত আছেন, যেখানে তাদের রক্ত ঝরেছে।”
তিনি আরও দাবি করেন, তিনি এবং আওয়ামী লীগের অন্যান্য শীর্ষ নেতারা কোনো লড়াকু মনোভাব নিয়ে নয়, বরং স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে চান। আদালতে আত্মসমর্পণ করে তাঁরা দেখতে চান যে বর্তমান প্রশাসন তাঁদের সাথে কেমন আচরণ করে।
২০২৪ সালের নজিরবিহীন ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালানোর পর, নির্বাসিত জীবনে এর আগে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের লিখিত প্রশ্নের জবাব দিলেও কখনো সরাসরি লাইভ সাক্ষাৎকার দেননি শেখ হাসিনা। এই প্রথম তিনি দেশে ফেরার একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা (আগামী ডিসেম্বর) বেঁধে দিলেন। একই সাথে নিজের ও নির্বাসিত অন্য আওয়ামী লীগ নেতাদের আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথাও প্রথম প্রকাশ্যে আনলেন।
উল্লেখ্য, শেখ হাসিনার পাশাপাশি তাঁর মন্ত্রিসভার অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ একাধিক শীর্ষ নেতা বর্তমানে মৃত্যুদণ্ডের সাজাপ্রাপ্ত। তবে নির্বাসনে থাকা আওয়ামী লীগের অন্য কোনো নেতার বর্তমান অবস্থান নিশ্চিত করতে পারেনি রয়টার্স।
শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে ঢাকা থেকে নয়া দিল্লিকে একের পর এক আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়া হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে হাসিনা বলেন, “বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ আমাকে দেশে ফেরাতে চায়, আমাকে ফেরত পাঠানোর জন্য তারা ভারতকে চিঠি দিচ্ছে। আমি নিজেই যাব। কবে বা কীভাবে দেশে ফিরব—সে বিষয়ে কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে আমি আলোচনা করিনি।”
শেখ হাসিনার এই আকস্মিক মন্তব্যের বিষয়ে রয়টার্সের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকারের মুখপাত্রদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এই সাক্ষাৎকারের বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে গত এপ্রিলেই দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশের অনুরোধ তারা আইনি ও কূটনৈতিকভাবে খতিয়ে দেখছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন পর শেখ হাসিনার এমন সরাসরি সাক্ষাৎকার এবং দেশে ফেরার সুনির্দিষ্ট ঘোষণা বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন নতুন আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেবে, তেমনি ঢাকা-নয়া দিল্লি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের টানাপোড়েন নিরসনেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

