১৮২৪ সালের এক শীতের সকালে যশোরের নিভৃত গ্রাম সাগরদাঁড়ির জমিদার পরিবারে বেজে উঠেছিল যে ক্রন্দনধ্বনি, কালক্রমে তা-ই হয়ে উঠেছিল বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে সাহসী ও বৈপ্লবিক কণ্ঠস্বর। আজ রোববার, ২৫ জানুয়ারি ২০২৬; বাংলা সাহিত্যের ধ্রুবতারা, মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ২০২তম জন্মবার্ষিকী। কপোতাক্ষ নদের কলতানে বেড়ে ওঠা এই কবির হাত ধরেই বাংলা কবিতা ও নাটক মধ্যযুগীয় আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধন ছিঁড়ে প্রবেশ করেছিল আধুনিকতার আলোকোজ্জ্বল ভুবনে।
মধুসূদনের জীবন ছিল কোনো ট্র্যাজিক নাটকের চেয়েও বেশি নাটকীয়। হিন্দু কলেজের সেই মেধাবী তরুণ, যিনি ‘স্ত্রী শিক্ষা’ নিয়ে প্রবন্ধ লিখে স্বর্ণপদক জিতেছিলেন, তিনিই একদিন কেবল চিন্তার স্বাধীনতার নেশায় ১৮৪৩ সালে গ্রহণ করেছিলেন খ্রিষ্টধর্ম। পিতৃগৃহ ত্যাগ করে সামাজিকভাবে একঘরে হওয়া এই মানুষটিই পরে মাদ্রাজ ও ইউরোপের পথে পথে ঘুরে অর্জন করেছেন গ্রিক, ল্যাটিন ও হিব্রু ভাষার পাণ্ডিত্য।
প্রথম দিকে ইংরেজি ভাষার প্রতি প্রবল মোহ থাকলেও, মধুসূদন দ্রুতই উপলব্ধি করেন—তার সৃজনের শ্রেষ্ঠ আধার মাতৃভাষা বাংলা। সেই উপলব্ধি থেকেই একে একে জন্ম নেয়:
বিপ্লবী ছন্দ: পয়ারের শেকল ভেঙে প্রবর্তন করেন ‘অমিত্রাক্ষর ছন্দ’।
মহাকাব্যের নতুন রূপ: ‘মেঘনাদ বধ কাব্য’র মাধ্যমে তিনি রাবণকে বীর হিসেবে চিত্রিত করে প্রথাগত চিন্তার মূলে কুঠারাঘাত করেন।
সনেট ও নাটক: ‘শর্মিষ্ঠা’, ‘পদ্মাবতী’ এবং ‘চতুর্দশপদী কবিতাবলী’র মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যকে উপহার দেন বিশ্বমানের বৈচিত্র্য। জীবনের শেষ বেলায় ব্যারিস্টারি ডিগ্রি থাকলেও দারিদ্র্য ছিল তার ছায়ার মতো সঙ্গী। প্যারিস ও লন্ডনের দিনগুলোতে বন্ধু ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নিঃস্বার্থ সহযোগিতা ছিল তার শেষ আশ্রয়। ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন চরম আর্থিক অনটনে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও, বাঙালির হৃদয়ে তিনি আজও অম্লান।
প্রতিবারের মতো সাগরদাঁড়িতে এবার জাঁকজমকপূর্ণ ‘মধুমেলা’র আয়োজন না থাকলেও মধুকবির স্মৃতিধন্য জন্মভূমিতে সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া যশোর জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহের উদ্যোগে আয়োজিত হবে বিশেষ স্মরণসভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
আমাদের পর্যবেক্ষণ: মধুসূদন কেবল একজন কবি ছিলেন না; তিনি ছিলেন আধুনিক বাঙালির আত্মপরিচয় নির্মাণের স্থপতি। আজ যখন আমরা বাংলা ভাষার বিশ্বজয়ের কথা বলি, তখন তার সেই অমোঘবাণী আজও আমাদের কানে বাজে— ‘হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন’। তাকে স্মরণের মাধ্যমেই আমাদের সাহিত্যিক চেতনা পূর্ণতা পায়।

