চারিদিকে তখন কেবলই মৃত্যুর গর্জন। আকাশ থেকে ধেয়ে আসছে একের পর এক বোমা। বিকট শব্দে কেঁপে উঠছে হাসপাতালের দেয়াল, খসে পড়ছে সিলিং। মানুষ দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটছে একটুখানি আশ্রয়ের খোঁজে। এমন এক নরককুণ্ডের মাঝে দাঁড়িয়ে নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে অনন্য এক মানবিকতার দৃষ্টান্ত গড়েছিলেন একজন ইরানি নার্স। তার নাম নেদা সালিমি।
যুদ্ধের শুরুতে, গত ১ মার্চের একটি শিউরে ওঠা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। সেখানে দেখা যায়, বোমাবর্ষণে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া একটি হাসপাতালের ভেতর দিয়ে অবর্ণনীয় সাহসিকতায় দুই হাতে তিন-তিনটি সদ্যোজাত শিশুকে বুকে চেপে ধরে নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে দৌড়ে যাচ্ছেন এক নারী। তিনি আর কেউ নন, রিয়েল লাইফ হিরোইন নেদা সালিমি।
“ওরা যেন আমারই সন্তান”
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম টিআরটি (TRT)-এর সাথে এক আবেগঘন সাক্ষাৎকারে সেই ভয়াল দিনের স্মৃতিচারণ করেন নেদা। তিনি বলেন:
“সেদিন আমাদের হসপিটালে ছয়টি শিশু ছিল। তিনটি শিশু ছিল তাদের মায়েদের সাথে, আর বাকি তিনজন ছিল আমাদের তত্ত্বাবধানে। বাচ্চাগুলোর বয়স তখন এক ঘণ্টাও পার হয়নি! আর তাদের মায়েরা তখনও অচেতন অবস্থায় অপারেটিং রুমে ছিলেন।”
নেদা আরও যোগ করেন, “যখন বিমান হামলা শুরু হলো, চারপাশের ভয়াবহতায় এক মুহূর্তের জন্য বুকটা কেঁপে উঠেছিল। কিন্তু পরক্ষণেই আমার মাথায় শুধু একটা চিন্তাই ঘুরছিল—যেকোনো মূল্যে এই নিষ্পাপ শিশুগুলোকে বাঁচাতে হবে। আমার মনে হচ্ছিল, ওরা অন্য কারও নয়, ওরা আমারই সন্তান।”
মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও কেন তিনি পালিয়ে যাননি? এমন প্রশ্নের জবাবে এই বীর স্বাস্থ্যকর্মী অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন, “স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে আমরা খোদার কাছে শপথ নিয়েছিলাম—আমাদের রোগীদের আমরা যেকোনো মূল্যে হেফাজত করব। বিপদের মুহূর্তে রোগীদের পাশে দাঁড়ানোটাকে আমরা আমাদের পবিত্র কর্তব্য বলে মনে করি। তাদের এই চরম সংকটে আমরা তো তাদেরকে ফেলে পালিয়ে যেতে পারি না।”
যুদ্ধের ভয়াবহতা যেখানে মানুষের ভেতরের মানবিকতাকে পিষে মারতে চায়, সেখানে নেদা সালিমির মতো মানুষেরা মনে করিয়ে দেন—পৃথিবীতে এখনও আলো বেঁচে আছে। নিজের জীবন বাজি রেখে তিনটি নতুন জীবনকে পৃথিবীর আলোয় টিকিয়ে রাখার এই গল্প আজ বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের চোখে জল এনে দিয়েছে, কুড়িয়েছে বিনম্র শ্রদ্ধা।

