প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সদ্য সমাপ্ত চীন সফরে দুই দেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন হয়েছে। দীর্ঘ আলোচনার পর অবশেষে বাংলাদেশ থেকে বড় পরিসরে জাতীয় ফল ‘কাঁঠাল’ আমদানির বিষয়ে একটি আনুষ্ঠানিক সমঝোতা স্মারক (MoU) সই করেছে চীন।
বিশ্বজুড়ে সব ধরনের শিল্প ও কৃষিপণ্য রপ্তানিতে শীর্ষে থাকা চীন কেন বাংলাদেশ থেকে কাঁঠাল আমদানিতে এতটা আগ্রহী, তা নিয়ে দেশের ব্যবসায়ী ও সাধারণ মহলে বেশ ইতিবাচক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, এই রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে মোট ১৭টি সমঝোতা স্মারক বা মেমোরেন্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং (MoU) স্বাক্ষরিত হয়েছে। যার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় অবকাঠামো উন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ডিজিটাল ইকোনমির মতো বড় বিষয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে কাঁঠাল নেওয়ার বিষয়টি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তি হিসেবে স্থান পেয়েছে।
বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে প্রধানমন্ত্রীর ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি
সফরে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন উল্লেখ করেন, চীন বাংলাদেশের অন্যতম বড় বাণিজ্য অংশীদার হলেও আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে এক বিশাল ব্যবধান ছিল। প্রধানমন্ত্রীর এই সফল সফরের ফলে বাংলাদেশের বিভিন্ন অপ্রচলিত ও কৃষিপণ্য চীনে রপ্তানির এক বিশাল বাজার ও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কাঁঠাল রপ্তানির এই চুক্তিটি মূলত সেই মহাপরিকল্পনারই একটি সফল অংশ।
চীনের আগ্রহ অবশ্য নতুন নয়: আমের পর এবার কাঁঠাল
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে কাঁঠাল ও পেয়ারার মতো গ্রীষ্মকালীন ফল আমদানিতে চীনের আগ্রহ হঠাৎ করে তৈরি হয়নি।
মে ২০২৫: চীন বাংলাদেশ থেকে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে ‘কাঁচা আম’ আমদানি শুরু করেছিল।
সে সময়ই বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত স্পষ্ট করেছিলেন যে, গুণগত মান ঠিক থাকলে আমদানির তালিকায় পরবর্তী পছন্দ হবে বাংলাদেশের সুস্বাদু কাঁঠাল ও পেয়ারা।
এরই ধারাবাহিকতায়, ২০২৬ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফরের মাধ্যমে কাঁঠাল রপ্তানির প্রক্রিয়াটি তার চূড়ান্ত ও আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের পর্যায়ে পৌঁছাল।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ও রপ্তানিকারকদের আশাবাদ:
কৃষি অর্থনীতিবিদ এবং ফল রপ্তানিখাত সংশ্লিষ্টরা এই চুক্তিকে বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির জন্য একটি বিশাল ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে:
উদ্বৃত্ত ফলের সঠিক ব্যবহার: বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল উৎপাদিত হয়, যার একটি বড় অংশই সঠিক সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে নষ্ট হয়ে যায়। চীনের মতো বিশাল বাজারে এই ফল নিয়মিত রপ্তানি করা গেলে কৃষকরা সরাসরি লাভবান হবেন।
প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের বিকাশ: শুধু আস্ত কাঁঠালই নয়, বরং কাঁঠালের কোয়া, চিপস কিংবা ক্যানড (Canned) কাঁঠাল রপ্তানির মাধ্যমে দেশে নতুন নতুন প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে উঠবে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় ভূমিকা রাখবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চীনে কাঁঠাল পাঠানোর আগে ফাইটোস্যানিটারি (উদ্ভিদ স্বাস্থ্য ও কোয়ারেন্টাইন) বিধিমালা কঠোরভাবে মেনে চলা হবে, যাতে প্রথম চালানের পর থেকেই চীনসহ আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি কাঁঠালের নির্ভরযোগ্যতা শতভাগ বজায় থাকে।

