অবশেষে ফুটবলপ্রেমীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটছে। বিশ্বফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট কার মাথায় উঠছে—স্পেন নাকি আর্জেন্টিনা, তা নির্ধারণ করতে আজ রোববার (১৯ জুলাই ২০২৬) নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে মহারণে মুখোমুখি হচ্ছে বিশ্বফুটবলের দুই পরাশক্তি। তবে মাঠের এই লড়াই কেবল ফুটবলীয় উত্তেজনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, টেক্সাসের মাঠ ছাড়িয়ে তা রূপ নিয়েছে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির এক অভূতপূর্ব সমীকরণে। অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা থেকে শুরু করে তেল আবিবের নীতি-নির্ধারণী মহল পর্যন্ত এই ম্যাচকে ঘিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
চলমান বৈশ্বিক টুর্নামেন্টের এই ফাইনাল ম্যাচ ঘিরে ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে আকাশচুম্বী আগ্রহ। গাজার সিংহভাগ মানুষ এবার প্রকাশ্যেই স্পেনের ট্রফি জয়ের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ফিলিস্তিনিদের এই সমর্থনের মূল ভিত্তি কিন্তু ফুটবল শৈলী নয়, বরং ফিলিস্তিন সংকটে স্পেনের মানবিক ও সাহসী রাজনৈতিক অবস্থান।
২০২৪ সালের মে মাসে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেন এবং গাজায় অবিলম্বে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও মানবিক সহায়তার পক্ষে বিশ্বমঞ্চে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন।
স্পেনের তরুণ বিস্ময় বালক লামিনে ইয়ামাল এবং ম্যানচেস্টার সিটির কিংবদন্তি স্প্যানিশ কোচ পেপ গার্দিওলাসহ স্পেনের ক্রীড়াঙ্গনের শীর্ষ ব্যক্তিত্বরা বিভিন্ন সময়ে গাজার নিপীড়িত মানুষের প্রতি প্রকাশ্য সংহতি জানিয়েছেন।
গাজার পঙ্গু ফুটবল দল ‘গাজা আল ইরাদা’ (গাজা ডিটারমিনেশন)-এর প্রধান কোচ হাতেম আল মাগরিবি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “যুদ্ধের গোলার আঘাতে এই খেলোয়াড়রা হয়তো তাদের হাত বা পা হারিয়েছে, কিন্তু যারা ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়িয়েছে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা প্রকাশের শক্তি হারায়নি। পুরো ফিলিস্তিনি জাতি চায় এবার স্পেনই বিশ্বকাপ জিতুক।”
টানা দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ইসরাইলি আগ্রাসনের কারণে গাজায় বসে খেলা দেখাই এক চরম যুদ্ধ। সাবেক ফুটবলার ও স্টেডিয়াম ব্যবস্থাপক আদনান আল আফিফি জানান, জ্বালানি সংকট ও চড়া মূল্যের কারণে জেনারেটর চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে বিদ্যুৎ থাকলেই কেবল মানুষ খেলা দেখতে পারছে।
এই চরম প্রতিকূলতার মাঝেই ফুটবলপ্রেমীদের একটু আনন্দ দিতে গাজা সিটির ‘প্যালেস্টাইন স্পোর্টস ক্লাব’-এ (যা বর্তমানে গাজার একমাত্র সচল ক্লাব) একটি প্রতীকী বিশ্বকাপ ম্যাচের আয়োজন করা হয়। গত বৃহস্পতিবার ও শনিবার সেখানে ফিলিস্তিন ও স্পেনের জার্সি পরিহিত দুটি দলের মধ্যে কৃত্রিম আবহে ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। ফুটবলারদের আন্তর্জাতিক ম্যাচের অনুভূতি দিতে সেখানে প্রতীকী ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR) এবং অফিশিয়াল রেফারিও রাখা হয়েছিল।
অন্যদিকে গাজা যখন স্পেনের জন্য প্রার্থনা করছে, ঠিক তখন ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার পক্ষে প্রকাশ্য সমর্থন ব্যক্ত করেছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। প্রভাবশালী হিব্রু সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টাইমস অব ইসরাইল’ এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
ইসরাইলে নিযুক্ত আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত রাব্বি শিমন অ্যাক্সেল ওয়ানিশের সঙ্গে এক কূটনৈতিক বৈঠকে নেতানিয়াহু এই শুভকামনা জানান। বৈঠককালে রাষ্ট্রদূত আর্জেন্টিনার কট্টর ইসরাইলপন্থী প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইর একটি বিশেষ বার্তা নেতানিয়াহুর কাছে হস্তান্তর করেন।
জবাবে আর্জেন্টিনার প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়ে নেতানিয়াহু বলেন: “হাভিয়ের (মিলেই), আপনি আমাদের একজন সত্যিকারের এবং অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আমরা সব সময়ই আর্জেন্টিনার পাশে আছি এবং নানা ক্ষেত্রেই তাদের অংশীদারিত্বকে সমর্থন করি। আজকের (রোববার) মেগা ফাইনালের জন্য আর্জেন্টিনার ফুটবল দলের প্রতি আমাদের পূর্ণ সমর্থন ও শুভকামনা রইল।”
নিউ জার্সির সবুজ গালিচায় আজ মেসি-আলভারেজ বনাম ইয়ামাল-রদ্রিদের মধ্যেকার ৯০ মিনিটের যুদ্ধই কেবল ফুটবল বিশ্ব উপভোগ করবে না, বরং এই ম্যাচের ফলাফলের ওপর আজ ভূরাজনৈতিক মনস্তাত্ত্বিক জয়-পরাজয়ও নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের কোটি মানুষের।

