আমরা প্রত্যেকেই আয় করি, খরচ করি, কিছুটা সঞ্চয় করি, আবার অনেক সময় ঋণও নিতে হয়। মাসের শুরুতে আমরা যেমন পরিকল্পনা করি—ভাড়া, বাজার, বিদ্যুৎ বিল, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও ভবিষ্যতের সঞ্চয়—তারপরও মাস শেষে অনেক সময় দেখা যায় হিসাব মেলে না।
রাষ্ট্রের বাজেটও ঠিক এভাবেই কাজ করে। পার্থক্য শুধু পরিসরে—একটি পরিবারের বদলে এখানে প্রায় ১৮ কোটি মানুষের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা করা হয়। এই বার্ষিক আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনাই জাতীয় বাজেট।
বাজেটের ধারণা
বাজেট শব্দটি শুনলে অনেকের মনে হয় এটি কেবল অর্থনীতিবিদ বা সরকারের বিষয়। কিন্তু বাস্তবে বাজেট আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। আপনি যেভাবে বাজার করেন, ফোন ব্যবহার করেন, ভ্রমণ করেন বা চিকিৎসা নেন—সবকিছুর পেছনেই বাজেটের প্রভাব থাকে।
অর্থাৎ বাজেট শুধু সংখ্যা নয়, এটি একটি দেশের জীবনযাত্রা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রতিচ্ছবি।
বাজেটের ইতিহাস
বাজেট শব্দটির উৎপত্তি ফরাসি শব্দ bougette থেকে, যার অর্থ ছোট চামড়ার ব্যাগ। আধুনিক বাজেট ধারণার সূচনা হয় ব্রিটেনে, ১৮ শতকে। তখন কর ও রাজস্ব সংক্রান্ত প্রস্তাব একটি ব্যাগে রাখা হতো এবং পরে তা পার্লামেন্টে উপস্থাপন করা হতো।
উপমহাদেশে প্রথম বাজেট উপস্থাপন করেন জেমস উইলসন ১৮৬০ সালে। পরে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের প্রথম বাজেট এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেট ১৯৭২ সালে তাজউদ্দীন আহমদের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়।
বাজেট কেন গুরুত্বপূর্ণ
একটি রাষ্ট্র কর আদায় করে জনগণের কল্যাণে ব্যয় করার জন্য। কিন্তু এই কর আরোপের সিদ্ধান্ত এককভাবে নেওয়া যায় না—এর জন্য জনগণের প্রতিনিধিদের অনুমোদন প্রয়োজন। এই ধারণার ভিত্তি গড়ে ওঠে ঐতিহাসিক *ম্যাগনা কার্টা* থেকে, যেখানে বলা হয় “প্রতিনিধিত্ব ছাড়া কর নয়”।
বাংলাদেশের সংবিধানেও বলা আছে, সংসদের অনুমোদন ছাড়া কোনো কর আরোপ করা যাবে না এবং প্রতি বছর সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব সংসদে উপস্থাপন করতে হবে।
সরকারের আয় কোথা থেকে আসে
সরকারের প্রধান আয় আসে কর থেকে—যেমন আয়কর, ভ্যাট, শুল্ক ইত্যাদি। এছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে আয়, জরিমানা, ভাড়া ও বিভিন্ন ফি থেকেও রাজস্ব পাওয়া যায়।
অর্থাৎ জনগণই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সরকারের আয়ের উৎস।
বাজেটের ব্যয়
সরকারের ব্যয় সাধারণত দুই ভাগে বিভক্ত:
১. রাজস্ব ব্যয়:
প্রশাসন, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, বেতন-ভাতা ইত্যাদি চলমান খরচ।
২. উন্নয়ন ব্যয়:
রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য অবকাঠামো নির্মাণসহ দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কার্যক্রম।
বাজেট ঘাটতি ও ঋণ
অনেক সময় সরকারের ব্যয় আয়ের চেয়ে বেশি হয়, যাকে বলা হয় বাজেট ঘাটতি। এই ঘাটতি পূরণে সরকার দেশি ও বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেয়।
অভ্যন্তরীণ ঋণ আসে ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে, আর বৈদেশিক ঋণ আসে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা থেকে।
অতিরিক্ত ঋণ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে, তাই এর ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
টাকা ছাপানোর বাস্তবতা
সরকার চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ সৃষ্টি করতে পারে, যা অনেক সময় “টাকা ছাপানো” নামে পরিচিত। তবে এতে সরাসরি সম্পদ তৈরি হয় না। উৎপাদন না বাড়িয়ে শুধু টাকা বাড়ালে মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি থাকে।
বাজেট ভালো না খারাপ বোঝার উপায়
বাজেট মূল্যায়নের জন্য কিছু বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—
সরকার কতটা অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নে ব্যয় করছে
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজেট কতটা কার্যকর
করের বোঝা কার ওপর পড়ছে
কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ আছে কি না
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি শক্তিশালী হচ্ছে কি না
উন্নয়ন প্রকল্পগুলো জনগণকেন্দ্রিক কি না
সরকারের ঋণ কতটা এবং তা কোথা থেকে নেওয়া হচ্ছে
শেষ কথা
বাজেট শুধু অর্থমন্ত্রীর ঘোষণা নয়। এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং জনগণের জীবনমানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি নথি। তাই বাজেট বোঝা মানে নিজের জীবন ও দেশের ভবিষ্যৎকে বোঝা।

