যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য যৌথ হামলার আশঙ্কার মাঝেই মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন মোড় নিয়েছে। চলমান সংঘাত নিরসন ও কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে ইরানকে পুরোপুরি বাগে আনতে ৫টি বড় এবং অত্যন্ত কঠিন শর্ত জুড়ে দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তেহরানের দেওয়া শান্তি প্রস্তাবের জবাবে ওয়াশিংটন এই পাল্টা শর্তগুলো দিয়েছে।
রোববার (১৭ মে ২০২৬) ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফারস নিউজ এজেন্সির এক বিশেষ প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। মার্কিন প্রশাসনের এই অনমনীয় অবস্থানের কারণে চলমান শান্তি আলোচনা এখন গভীর অচলাবস্থার দিকে মোড় নিচ্ছে।
আলোচনার টেবিল থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করতে ওয়াশিংটন যে শর্ত ও নীতিগত অবস্থান নিয়েছে, তার মূল বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
১. ইউরেনিয়াম হস্তান্তর: ইরানের উৎপাদিত ৪০০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরাসরি আমেরিকার হাতে তুলে দিতে হবে।
২. পারমাণবিক স্থাপনা বন্ধ: ইরানের পরমাণু কর্মসূচির আওতাধীন যতগুলো স্থাপনা রয়েছে, তার মধ্যে ভবিষ্যতে কেবল একটিমাত্র পারমাণবিক কেন্দ্র সচল রাখার অনুমতি দেওয়া হবে; বাকিগুলো বন্ধ করতে হবে।
৩. রিজার্ভ অবমুক্তিতে অস্বীকৃতি: বিশ্বজুড়ে আটকে (ফ্রিজ) রাখা ইরানের বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সম্পদের অন্তত ২৫ শতাংশ অবমুক্ত করার দাবিও সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে মার্কিন প্রশাসন।
৪. ক্ষতিপূরণ না দেওয়া: পূর্ববর্তী মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে ইরানের যে বিপুল আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ দিতে সাফ অস্বীকৃতি জানিয়েছে হোয়াইট হাউস।
৫. আঞ্চলিক সংঘাতের শর্ত: মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ফ্রন্টে চলমান সামরিক সংঘাতের অবসান ঘটার বিষয়টি এই আলোচনার ধারাবাহিকতা ও সফল সমাপ্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল বলে লিংক বা জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘ওয়াইনেট নিউজ’-এর সতর্কতা: ইরান যদি আমেরিকার এই সবকটি শর্ত মেনেও নেয়, তবুও ইরানের ওপর মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক আগ্রাসনের স্থায়ী হুমকি পুরোপুরি বহাল থাকবে।
মার্কিন এই পাল্টা শর্তের প্রতিক্রিয়ায় ইরানের গণমাধ্যম ও কর্মকর্তারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা মেহের এক সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করেছে, “আমেরিকা নিজে কোনো ত্যাগ বা ছাড় না দিয়ে, মূলত যুদ্ধের ময়দানে যেসব সুবিধা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছিল, তা এখন আলোচনার টেবিলে ছলে-বলে-কৌশলে আদায় করতে চাচ্ছে।”
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের দেওয়া ১৪ দফার শান্তি প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। এর জবাবে আলোচনার টেবিলে বসার জন্য ইরানের পক্ষ থেকেও ৫টি ‘আস্থা-বিল্ডিং’ (Confidence-building) পূর্বশর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে:
১. লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলের হামলাসহ সবকটি ফ্রন্টে অবিলম্বে সামরিক সংঘাতের স্থায়ী অবসান ঘটাতে হবে।
২. ইরানের ওপর আরোপিত সমস্ত অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহার করতে হবে।
৩. আন্তর্জাতিক ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের সব ফান্ড বা অর্থ অবিলম্বে ছেড়ে দিতে হবে।
৪. যুদ্ধের কারণে ইরানের অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির জন্য উপযুক্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে।
৫. বিশ্ব জ্বালানি বাজারের অন্যতম প্রধান নৌ রুট ‘হরমুজ প্রণালি’-র ওপর ইরানের নিজস্ব একচ্ছত্র সার্বভৌমত্বের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিতে হবে।
কূটনৈতিক এই টানাপোড়েনের বিষয়ে গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র সমালোচনা করে লেখেন:
“এটি তাদের দীর্ঘদিনের অত্যন্ত সুপরিচিত এবং কুৎসিত একটি কৌশল—প্রথমে তারা নিজেরাই কৃত্রিমভাবে সংকট ও যুদ্ধ তৈরি করে, এরপর আবার সেই যুদ্ধকে আরও উসকে দেয় এবং সবশেষে তার ওপর ‘স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার’ ও ‘শান্তি রক্ষা’র এক মহৎ ব্যানার ঝুলিয়ে দেয়। মূলত তারা বিশ্বজুড়ে একটি ধ্বংসস্তূপ বা মরুভূমি তৈরি করে এবং পরবর্তীতে ধূর্ততার সঙ্গে সেটাকেই শান্তি বলে দাবি করে।”
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথ বাহিনী ইরানের অভ্যন্তরে একযোগে ব্যাপক সামরিক ও বিমান হামলা চালালে এই অঞ্চলের পরিস্থিতি বিস্ফোরক হয়ে ওঠে। সেই আগ্রাসনের পর ইরানও লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালিতে পাল্টা প্রতিরোধমূলক হামলা চালায়, যার ফলে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম হু হু করে বাড়ে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়।
পরবর্তীতে বন্ধু রাষ্ট্র পাকিস্তানের বিশেষ কূটনৈতিক মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল উভয় পক্ষের মধ্যে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি অর্জিত হয়েছিল। তবে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো সম্ভব হলেও মূল নীতিগত বিরোধগুলোর সমাধান না হওয়ায় এবং উভয় পক্ষের শর্তের মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান থাকায় স্থায়ী কোনো শান্তি চুক্তি এখনো আলোর মুখ দেখেনি।

