ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত এবং পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ দ্বারা কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত দল আওয়ামী লীগ আবারও রাজনীতির মাঠে ফেরার জন্য ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে। মূল দল ও সহযোগী সংগঠনগুলোর বিভিন্ন স্তরে নতুন করে গোপনে কমিটি গঠনের পাশাপাশি জনমনে প্রভাব ফেলে এমন কিছু সংবেদনশীল ইস্যুকে সামনে এনে তারা মাঠ গরমের চেষ্টা চালাচ্ছে।
বিশেষ করে সাম্প্রতিক ‘হামের টিকা সংক্রান্ত জটিলতা’ এবং বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি’র বিষয়কে পুঁজি করে সদ্য বিদায়ী প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তার উপদেষ্টামণ্ডলীর বিচারের দাবিতে সোচ্চার হচ্ছে দলটির নেতাকর্মীরা।
আওয়ামী লীগ এখন বর্তমান বিএনপি সরকারকে সরাসরি আক্রমণ না করে, সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারকে রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে হেয় প্রতিপন্ন করার কৌশল নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তার সরকারের উপদেষ্টাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে গত রোববার (১৭ মে ২০২৬) হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন দায়ের করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে নতুন আরেকটি রিট আবেদনও করা হয়েছে।
এর আগে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে আপত্তিকর স্লোগান ও ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ইস্যুভিত্তিক কর্মসূচিগুলোকে ক্রমান্বয়ে বর্তমান বিএনপি সরকারবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা রয়েছে দলটির।
আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্রের তথ্যমতে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রচণ্ড চাপে থাকা দলটি ধারণা করেছিল, নির্বাচিত সরকার হিসেবে বিএনপি ক্ষমতায় এলে তারা রাজনীতিতে কিছুটা ‘স্পেস’ বা সুযোগ পাবে। এই প্রত্যাশায় নির্বাচনের আগে দলটির একটি অংশ প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে বিএনপির পক্ষে ভোট চেয়েছিল এবং বিএনপির কিছু নেতাও তাদের আশ্বস্ত করেছিলেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।
এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের দেওয়া ‘আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধকরণ অধ্যাদেশ’টি বিএনপি সরকার আইনে পরিণত করবে না বলেও তারা আশা করেছিল। কিন্তু বর্তমান বিএনপি সরকার হুবহু ওই অধ্যাদেশটিকে আইনে পরিণত করে এর বৈধতা দিয়েছে। এছাড়া নির্বাচনের পরপরই দেশের কয়েকটি স্থানে আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় খুলতে গিয়ে তারা বিএনপি নেতাকর্মীদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়ে।
বর্তমানে দলটির শীর্ষ নেতারা বিভিন্ন অ্যাপস ব্যবহার করে তৃণমূলের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। দলটির অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে ‘প্রত্যাবর্তন ২.০ লোডিং’ শিরোনামে পোস্টার আপলোড করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন অডিও ক্লিপে (যার সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি) শেখ হাসিনাকে দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে বলতে শোনা যায়, যেখানে যেখানে কমিটি নেই, সেখানে দ্রুত কমিটি গঠন করে একসঙ্গে মাঠে নামতে হবে। তিনি আগামীতে আবারও দ্রুত নির্বাচন হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “তা ভাগ্যে আমার যা-ই থাকুক, এ বছরের মধ্যেই আমি দেশে আসব।” দল পুনর্গঠনের এই প্রক্রিয়ায় বিগত সাড়ে ১৫ বছরে যারা কম বিতর্কিত ছিলেন এবং ৫ আগস্টের পর সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন, তাদের নতুন কমিটিতে স্থান দেওয়া হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ এড়াতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা গভীর রাতে বা খুব ভোরে কয়েক সেকেন্ড বা কয়েক মিনিটের জন্য ‘ঝটিকা মিছিল’ করার কৌশল নিয়েছে। শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে গত রোববারও রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় এমন একটি ঝটিকা মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া সম্প্রতি মারা যাওয়া আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের জানাজাকে ঘিরে চট্টগ্রামে দলটির নেতাকর্মীরা বড় ধরনের শোডাউন ও স্লোগান দেয়। অন্যদিকে, গত ২৭ এপ্রিল কক্সবাজারের ১৭৩ জন আইনজীবী জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার ও সরকারের কাছে আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন।
বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর ড. মাহবুব উল্লাহ এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন:
“একটি নিষিদ্ধ ঘোষিত দল কীভাবে এই ধরনের আস্ফালন দেখানোর সাহস পায়, তা বোধগম্য নয়। আমার মনে হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথেষ্ট তৎপর নয়। ফ্যাসিবাদবিরোধী সব রাজনৈতিক শক্তির দায়িত্ব হবে বারবার আওয়ামী লীগের সেই দুঃশাসন, গুম-খুন, অর্থপাচার ও জুলুম-নির্যাতনের বিষয়টি জনগণের সামনে তুলে ধরা।”
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. সাহাবুল হক মনে করেন, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে প্রশাসন ও পেশাজীবী মহলে আওয়ামী লীগের যে নেটওয়ার্ক রয়েছে, তারা সেটিকে ব্যবহার করে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ অপপ্রচার চালাচ্ছে। সরকার ও অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে অনৈক্য থাকলে ভবিষ্যতে এই নিষিদ্ধ দলটি আরও সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পেয়ে যেতে পারে, যা বর্তমান সরকারের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হতে পারে।
তবে বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, নিষিদ্ধ এই সংগঠনটিকে রাজনীতিতে ন্যূনতম কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না এবং যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা নস্যাৎ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি ও গ্রেপ্তার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

