Bangla FM
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • বিশ্ব
  • সারাদেশ
  • বিনোদন
  • খেলাধুলা
  • কলাম
  • ভিডিও
  • অর্থনীতি
  • ক্যাম্পাস
  • আইন ও আদালত
  • প্রবাস
  • বিজ্ঞান প্রযুক্তি
  • মতামত
  • লাইফস্টাইল
No Result
View All Result
Bangla FM

উলগুলানের মহানায়ক বিরসা মুন্ডা: আদিবাসী অধিকার, মর্যাদা ও মুক্তির সংগ্রামের এক অমর প্রতীক

Bangla FM OnlinebyBangla FM Online
২:২১ pm ০৯, জুন ২০২৬
in Semi Lead News, কলাম
A A
0

সৈয়দ আমিরুজ্জামান 

ভারতীয় উপমহাদেশের ঔপনিবেশিক ইতিহাসে এমন কিছু সংগ্রামী ব্যক্তিত্ব আছেন, যাঁদের অবদান মূলধারার ইতিহাসচর্চায় দীর্ঘদিন উপেক্ষিত থেকেছে। অথচ তাঁদের সংগ্রাম শুধু একটি জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই নয়, বরং শোষণ, বঞ্চনা ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মানবমুক্তির এক উজ্জ্বল অধ্যায়। তেমনই এক কিংবদন্তি নাম বিরসা মুন্ডা। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে তিনি শুধু একজন নেতা নন; তিনি মুক্তির স্বপ্নদ্রষ্টা, আত্মমর্যাদার প্রতীক এবং প্রতিরোধের চিরন্তন প্রেরণা। তাঁর নেতৃত্বে সংঘটিত ‘উলগুলান’ বা ‘মহাবিদ্রোহ’ ভারতীয় উপমহাদেশের ঔপনিবেশিক বিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

প্রতি বছর ৯ জুন বিরসা মুন্ডার শাহাদাৎ দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—ভূমি, বন, সংস্কৃতি ও স্বকীয়তা রক্ষার সংগ্রাম কখনো কেবল অর্থনৈতিক প্রশ্ন নয়; এটি অস্তিত্বের প্রশ্ন, আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।

বিরসা মুন্ডার আবির্ভাব: এক সংকটকালীন সময়ের সন্তান

১৮৭৫ সালের ১৫ নভেম্বর বর্তমান ভারতের ঝাড়খণ্ড অঞ্চলের উলিহাতু গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন বিরসা মুন্ডা। তখন ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চলে বসবাসকারী মুন্ডা, ওরাঁও, সাঁওতালসহ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠী ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, জমিদারি প্রথা, মহাজনী শোষণ এবং বন ও জমির ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের ফলে চরম সংকটে নিপতিত হয়েছিল।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বন পরিষ্কার করে চাষযোগ্য জমি তৈরি করেছিল আদিবাসীরা। কিন্তু ব্রিটিশ প্রশাসন নতুন ভূমি আইন ও রাজস্ব ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই জমির ওপর তাদের ঐতিহ্যগত অধিকার অস্বীকার করে। জমির মালিকানা চলে যায় জমিদার, জোতদার ও মহাজনদের হাতে। আদিবাসীরা নিজেদের ভূমিতেই পরিণত হয় শ্রমিক ও প্রজায়।

এই পরিস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক বঞ্চনা সৃষ্টি করেনি; ধীরে ধীরে আঘাত হেনেছিল তাদের সামাজিক জীবন, সংস্কৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং আত্মপরিচয়ের ওপরও। এই বহুমাত্রিক সংকটের ভেতর থেকেই উঠে আসেন বিরসা মুন্ডা।

সামাজিক ও ধর্মীয় পুনর্জাগরণের অগ্রদূত

বিরসা খুব অল্প বয়সেই উপলব্ধি করেছিলেন যে শুধু রাজনৈতিক সংগ্রাম যথেষ্ট নয়; জনগণের আত্মবিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে জাগিয়ে তুলতে হবে। তিনি আদিবাসীদের মধ্যে আত্মমর্যাদা, ঐক্য এবং সামাজিক সংস্কারের আহ্বান জানান।

তিনি মদ্যপান, কুসংস্কার, সামাজিক বিভাজন এবং আত্মবিনাশী আচরণের বিরুদ্ধে প্রচার চালান। একই সঙ্গে তিনি আদিবাসী ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেন। তাঁর অনুসারীরা পরিচিত হয় ‘বিরসাইত’ নামে।

বিরসা মুন্ডা বুঝেছিলেন, শাসকশ্রেণি শুধু অর্থনৈতিক শোষণের মাধ্যমে জনগণকে দমন করে না; সাংস্কৃতিক আধিপত্য ও মানসিক দাসত্বও শোষণের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। তাই তিনি আদিবাসীদের মধ্যে আত্মপরিচয়ের চেতনা জাগিয়ে তুলতে সচেষ্ট হন।

উলগুলান: মহাবিদ্রোহের ডাক

১৮৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে বিরসার নেতৃত্বে আদিবাসী জনগণের মধ্যে এক ব্যাপক গণআন্দোলনের সূচনা হয়, যা ইতিহাসে ‘উলগুলান’ নামে পরিচিত। উলগুলান শব্দের অর্থ ‘মহা আলোড়ন’ বা ‘মহাবিদ্রোহ’।

এই আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য ছিল—

আদিবাসীদের ভূমির অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা;
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান;
জমিদার, মহাজন ও শোষকগোষ্ঠীর আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ;
আদিবাসী সমাজের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা।

বিরসা মুন্ডা ঘোষণা করেছিলেন, এই ভূমির প্রকৃত মালিক আদিবাসীরা। তিনি “মুন্ডারাজ”-এর স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন—এক এমন সমাজব্যবস্থা, যেখানে শোষণ থাকবে না এবং জনগণ নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই নির্ধারণ করবে।

১৮৯৫ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করে কারারুদ্ধ করে। কিন্তু কারাগার তাঁর মনোবল ভাঙতে পারেনি। মুক্তি পাওয়ার পর তিনি আরও সংগঠিতভাবে আন্দোলন গড়ে তোলেন।

১৮৯৯-১৯০০ সালে আন্দোলন সশস্ত্র রূপ লাভ করে। বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা, পুলিশ ফাঁড়ি এবং ঔপনিবেশিক ক্ষমতার প্রতীকী কেন্দ্রগুলোর বিরুদ্ধে আক্রমণ পরিচালিত হয়। ব্রিটিশ প্রশাসন আন্দোলন দমনে ব্যাপক সামরিক অভিযান চালায়।

গ্রেপ্তার ও মৃত্যু

১৯০০ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি বিরসা মুন্ডা ব্রিটিশ বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন। তাঁকে রাঁচি কারাগারে বন্দি রাখা হয়। একই বছরের ৯ জুন মাত্র ২৫ বছর বয়সে তিনি কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন।

সরকারি নথিতে তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে কলেরার কথা উল্লেখ করা হলেও দীর্ঘদিন ধরে তাঁর অনুসারী ও গবেষকদের একাংশের মধ্যে সন্দেহ রয়েছে যে, এটি স্বাভাবিক মৃত্যু ছিল না। তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে নানা প্রশ্ন আজও আলোচনায় রয়েছে।

তবে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বিরসা মুন্ডার সংগ্রামের সমাপ্তি ঘটেনি। বরং তিনি পরিণত হন প্রতিরোধ ও মুক্তির এক অমর প্রতীকে।

বিরসা মুন্ডার সংগ্রামের ঐতিহাসিক তাৎপর্য

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বিরসা মুন্ডার অবদান বহুমাত্রিক।

প্রথমত, তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে আদিবাসী জনগোষ্ঠী কেবল শোষণের শিকার কোনো নিষ্ক্রিয় জনগোষ্ঠী নয়; তারা সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম।

দ্বিতীয়ত, তাঁর আন্দোলন ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর জনগণের ঐতিহাসিক অধিকারের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে।

তৃতীয়ত, তিনি সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার মধ্যে গভীর সম্পর্কের বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন।

চতুর্থত, তাঁর আন্দোলন পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ সরকারকে ছোটনাগপুর অঞ্চলের ভূমি-সংক্রান্ত নীতিতে পরিবর্তন আনতে বাধ্য করে। পরবর্তীকালে ছোটনাগপুর টেন্যান্সি অ্যাক্ট (১৯০৮) প্রণয়নের পেছনে বিরসা আন্দোলনের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ বলে ইতিহাসবিদরা মনে করেন।

বিরসা মুন্ডার প্রাসঙ্গিকতা

একবিংশ শতাব্দীতেও বিরসা মুন্ডার সংগ্রাম অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

বিশ্বব্যাপী উন্নয়নের নামে বন উজাড়, খনিজ সম্পদ আহরণ, বৃহৎ শিল্প প্রকল্প এবং করপোরেট দখলদারিত্বের ফলে আদিবাসী জনগোষ্ঠী নানা সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। ভূমি হারানো, বাস্তুচ্যুতি, পরিবেশ ধ্বংস এবং সাংস্কৃতিক বিলুপ্তির ঝুঁকি ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বাংলাদেশেও পার্বত্য চট্টগ্রাম, সমতলের আদিবাসী অঞ্চল এবং বনাঞ্চল ঘিরে ভূমি, বন ও জীবন-জীবিকার প্রশ্নে নানা সমস্যা বিদ্যমান। এই বাস্তবতায় বিরসা মুন্ডার সংগ্রাম আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়—

উন্নয়ন কাদের জন্য?
প্রাকৃতিক সম্পদের মালিক কে?
রাষ্ট্র কীভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করবে?
সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষা ছাড়া কি গণতন্ত্র পূর্ণতা পেতে পারে?

বিরসা মুন্ডার জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়, সামাজিক ন্যায়, সাংস্কৃতিক মর্যাদা এবং অর্থনৈতিক অধিকারও অপরিহার্য।

সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জনস্মৃতিতে বিরসা

বিরসা মুন্ডার সংগ্রাম সাহিত্য ও সংস্কৃতিতেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। প্রখ্যাত সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘অরণ্যের অধিকার’-এ বিরসা মুন্ডার জীবন ও আন্দোলনকে অসাধারণ শক্তিশালী ভাষায় তুলে ধরেছেন।

ভারত ও বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনেও বিরসা মুন্ডা প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন। তাঁর জীবন নিয়ে গবেষণা, নাটক, চলচ্চিত্র, গান ও সাহিত্যকর্ম আজও নির্মিত হচ্ছে।

আদিবাসী অধিকার, মর্যাদা ও মুক্তির সংগ্রামের অমর প্রতীক এবং উলগুলানের মহানায়ক বিরসা মুন্ডা’র স্মরণে তাঁকে উৎসর্গ করে লেখা কবিতা

“উলগুলানের মহানায়ক”

১

ছোটনাগপুর পাহাড় জাগে, শাল-মহুয়ার বন,
ভোরের শিশির বুকে মেখে গায় প্রাচীনের ধ্বন।
নদীর জলে আকাশ ভাসে, মাটির গায়ে গান,
সেই মাটিতে জন্ম নিল এক অগ্নিমানব প্রাণ।

পনেরোই নভেম্বর দিনে উঠল নতুন সূর্য,
অরণ্যেরই গভীর বুকের অমল অগ্নিপুরুষ।
শোষিত মানুষের চোখে তখন জমে আছে ক্ষত,
বঞ্চনারই দীর্ঘ রাতে নিভে গেছে কত রথ।

জমি তাদের, ফসল তাদের, ঘামও তাদেরই,
তবু কেন সে অধিকারে বসে অন্য কেউ?
কেন তবে সেই শ্রমের ফল যায় লুটেরার ঘরে?
কেন মানুষ আপন দেশে পরবাসী হয়ে মরে?

এই প্রশ্নের বজ্রধ্বনি উঠল একদিন,
বিরসা নামে জেগে উঠল অরণ্যের সন্তান বিন্দু-চিন।

২

বনের পথে বয়ে যেত যে বাতাস গোপন সুরে,
সেই বাতাসে বিরসা শুনত ইতিহাসের নূরে।
শুনত কত পূর্বপুরুষ রক্ত দিয়ে গেছে,
নিজের ভূমি রক্ষার শপথ বুকের মাঝে বেঁধে।

শুনত নদী কাঁদছে নীরব, পাহাড় করছে হাহাকার,
জমিদার আর দালাল ঘিরে করেছে অন্ধকার।
ইংরেজ শাসন বিষের মতো ঢুকেছে গ্রামজুড়ে,
মানুষগুলো ঋণের ফাঁদে হারায় দিনের আলো ঘুরে।

মহাজনের খাতার পাতায় বাঁধা পড়ে প্রাণ,
খাজনার বোঝা মাথায় নিয়ে নিভে যায় সম্মান।
অরণ্য কেটে, মাটি কেটে, গড়ে যারা ক্ষেত,
তাদের বুকে আঘাত নামে অবিরাম অবিরত।

বিরসা তখন দেখল স্পষ্ট সময় এসেছে আর,
শুধু নালিশ করে নয়, চাই সংগ্রামের অঙ্গার।

৩

তিনি বললেন— “মানুষ আগে, মর্যাদা তার মূল,
নিজের ধর্ম, নিজের ভাষা হোক স্বাধীন ফুল।
যে সংস্কৃতি মায়ের মতো দিয়েছে পরিচয়,
তার উপরে অন্য শাসন চাপিয়ে দিলে ক্ষয়।

আমার অরণ্য আমার প্রাণ, আমার নদীর ঢেউ,
আমার মাটির অধিকারে দাঁড়াক না আর কেউ।
আমার ধর্ম অবহেলায় পদদলিত হলে,
আমি নীরব থাকব কেন অন্যায়েরই দলে?

যে শোষক শুধু লুটতে জানে, মানুষ চিনে না,
তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হবে— থামবে কোনোদিন না।”

এই বাণীতে আগুন জ্বলে গ্রাম থেকে গ্রাম,
মুন্ডা হৃদয় জেগে ওঠে শুনে সংগ্রাম-নাম।

৪

বিরসাইতের পতাকা তখন উড়ল দিগন্ত জুড়ে,
অসহায়ের বুকের ভেতর সাহস এল ঘুরে।
মানুষ বলল— “এসেছে কেউ আমাদেরই মাঝে,
যে বলেছে মাথা তুলে দাঁড়াও নিজের কাজে।”

বনের পথের নৈশসভায় জ্বলল মশাল-শিখা,
চোখে চোখে প্রতিজ্ঞারই দীপ্ত অগ্নিরেখা।
তীর-ধনুক আর টাঙি হাতে দাঁড়াল তরুণ দল,
অন্যায়েরই দুর্গ ভাঙার উঠল মহাকলরব।

কারও হাতে সোনা ছিল না, ছিল না বাহিনী,
তবু ছিল বিশ্বাস ভরা মুক্তির চিরদিনী।
কামান যদি শাসকের হয়, বন্দুক যদি তার,
মানুষ যদি জেগে ওঠে কে রুখিবে আর?

৫

ইংরেজ শাসক বুঝল তখন জাগছে নতুন ঢেউ,
ভয় ঢুকেছে ক্ষমতারই প্রাসাদময় নৌ।
তারা চাইল কারাগারে আটকে রাখতে প্রাণ,
বন্ধ শিকল ভেবে নিল রুখবে বিদ্রোহ-গান।

গ্রেপ্তার হলেন বিরসা তখন, বন্দী অন্ধ কক্ষে,
তবু তাঁরই দীপ্ত শপথ জ্বলল লক্ষ লক্ষ চোখে।
লোহার শিকল থামাতে কি পারে মানুষের মন?
কারারুদ্ধ দেহের ভেতর জাগে মুক্তি-ধ্বনন।

দুইটি বছর কারাগারে কাটল কঠিন ক্ষণে,
তবু ফিরে এলেন তিনি আরও দৃঢ় মনে।
যে আগুনে লোহা পুড়ে হয় ইস্পাতসম,
বিরসারও চেতনা হলো তেমনি দুর্দম।

৬

আবার শুরু সংগঠনের নিরব গোপন কাজ,
আবার বনের অন্ধকারে জ্বলে বিদ্রোহ-সাজ।
আবার শোনা যায় পাহাড়ে সেই আহ্বানের বাণী,
“নিজের ভূমি রক্ষার তরে প্রস্তুত হও জানি।”

উলগুলান— সেই নাম তখন বজ্র হয়ে বাজে,
মুন্ডা হৃদয় ঝড়ের মতো ওঠে সংগ্রাম-মাঝে।
শুধু একটি বিদ্রোহ নয়, আত্মমর্যাদার ডাক,
দাসত্বভাঙা মানুষেরই স্বাধীনতার পাক।

গির্জা, থানা, শোষকেরই প্রতীকের বিরুদ্ধে,
ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলনের স্রোতে।
শতাব্দীর জমাট ক্ষত ফেটে উঠে রণ,
অত্যাচারের প্রতিউত্তর দেয় অবহেলিত জন।

৭

তবু ছিল না ঘৃণাই শুধু বিরসার সংগ্রামে,
ছিল মানুষের অধিকার সমতারই নামে।
তিনি চেয়েছেন ভূমির উপর প্রকৃত মালিকানা,
শ্রমের বিনিময়ে মানুষ পাক সম্মানের ঠিকানা।

তিনি চেয়েছেন ধর্ম যেন থাকে মুক্ত আলোয়,
কোনো শক্তি বলপ্রয়োগে না টানে অন্য ঢালোয়।
তিনি চেয়েছেন সংস্কৃতি তার আপন রূপে বাঁচুক,
বহুজনের এই পৃথিবী বহুত্বে আলো আঁকুক।

অরণ্যেরই অধিকার আর মানুষেরই মান,
এই ছিল তাঁর রাজনৈতিক গভীর মহাগান।
শোষণের সব দেয়াল ভেঙে উঠুক নতুন ভোর,
এই স্বপ্নে তিনি জীবন দিলেন অবিচল ঘোর।

৮

বিদ্রোহ যখন ছড়িয়ে গেল অঞ্চল হতে অঞ্চলে,
শাসক তখন সাঁড়াশি সব আঘাত নামায় দলে।
চারদিকের বন পাহাড়ে শুরু হলো খোঁজ,
বিপ্লবীদের ধরতে তারা সাজাল মৃত্যির বোঝ।

অবশেষে একদিন এল বিশ্বাসঘাতক ক্ষণ,
আত্মগোপন ভেঙে গিয়ে ধরা পড়ল মন।
তেরোই ফেব্রুয়ারি দিনে বন্দী হলেন তিনি,
সঙ্গে আরও শত সহযোদ্ধা— সংগ্রামী জন।

রাঁচি কারার অন্ধকারে আবদ্ধ হলো দেহ,
কিন্তু তাঁরই উচ্চারণে কাঁপল শাসক গেহ।
কারণ তারা জানত ভালো মানুষ মরে যায়,
তবু মানুষের মুক্তির স্বপ্ন কোনোদিন না হারায়।

৯

নয়ই জুনের সেই সকাল আজও প্রশ্ন তোলে,
কীভাবে তবে নিভল প্রদীপ কারাগারের কোলে?
মাত্র পঁচিশ বছরেরই তরুণ বিপ্লবী প্রাণ,
হঠাৎ করে থেমে গেল কি শুধু মৃত্যুর টান?

ইতিহাসের পাতা জুড়ে বিতর্ক রয়ে যায়,
কিন্তু সত্য— তাঁর আত্মত্যাগ আজও আলো ছড়ায়।
যে মানুষটি মাটির তরে দিয়েছিলেন জীবন,
তিনি আজও অরণ্যেরই চিরজাগ্রত স্পন্দন।

শাসক ভেবেছিল মৃত্যু দিয়ে থামবে তাঁর গান,
কিন্তু সেই গান ছড়িয়ে গেল লক্ষ কণ্ঠে প্রাণ।
তীরের ডগায়, ঢোলের তালে, উৎসবেরই সুরে,
বিরসা আছেন মানুষেরই রক্তের ভেতর ঘুরে।

১০

আজও যখন আদিবাসী হারায় ভূমির অধিকার,
আজও যখন বন উজাড়ে কাঁদে সবুজ পাহাড়,
আজও যখন ভাষা-সংস্কৃতি অবহেলায় ক্ষয়,
তখন বিরসা পথ দেখান— সংগ্রামেই জয়।

আজও যখন উন্নয়নের নামে আসে লুট,
মুনাফারই অন্ধ নেশায় কেটে ফেলা হয় শিকড়-মূল,
তখন তাঁরই অগ্নিবাণী জেগে ওঠে ফের—
“মানুষ আগে, মাটি আগে, রুখে দাঁড়াও ঘের।”

তিনি কেবল মুন্ডাদের নন, সকল নিপীড়িতের,
তিনি প্রতীক প্রতিরোধের, সাহসী ভবিষ্যতের।
তিনি বলেন— ন্যায়বিচার ছাড়া শান্তি মেলে না,
মানবমর্যাদা পদদলিত হলে মাথা নত চলে না।

১১

মহাশ্বেতার কলম জুড়ে যাঁর জীবন মহাকাব্য,
অরণ্যের অধিকার হয়ে উঠেছে চিরসাব্য।
সাহিত্যেরও পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় তাঁরই দীপ্ত নাম,
সংগ্রামী মানুষের কাছে তিনি অনির্বাণ ধাম।

গবেষকের চিন্তায় তিনি ইতিহাসের পাঠ,
কবির কাছে জাগ্রত রণ, শিল্পীর কাছে ঘাট।
আন্দোলনের মিছিলে তিনি উচ্চারিত শপথ,
বঞ্চিতের চোখে তিনি মুক্তি-স্বপ্নরথ।

১২

হে বিরসা, তোমার প্রতি আজ আমাদের প্রণাম,
অরণ্যেরই গভীর বুক থেকে ওঠে সালাম।
তোমার তীর হারেনি মোটে কামানেরই কাছে,
কারণ তোমার চেতনা আজ কোটি প্রাণে আছে।

তোমার স্বপ্ন বেঁচে থাকে ধানক্ষেতের হাওয়ায়,
মহুয়ার গন্ধ মেখে যায় রক্তিম প্রত্যাশায়।
পাহাড় ডাকে তোমার নাম, নদী গায় সংগীত,
মাটির মানুষ উচ্চারণে রাখে তোমায় নিত্য স্মৃতি।

উলগুলানের অগ্নিশিখা নিভে যায়নি আজ,
অন্যায়েরই বিরুদ্ধে সে জ্বালায় সংগ্রাম-সাজ।
মানুষ যত স্বাধীনতার নতুন গান রচিবে,
বিরসা মুন্ডার অমর নাম তত উজ্জ্বল হবেই।

শালবনের ছায়া ভেঙে উঠুক নতুন ভোর,
শোষণহীন পৃথিবী গড়ুক মানুষেরই ঘর।
ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি পাক সমমর্যাদার স্থান,
ভূমির উপর প্রতিষ্ঠিত হোক শ্রমজীবী প্রাণ।

এই হোক আজ অঙ্গীকার, এই হোক সম্মান,
শহীদ বিরসা মুন্ডার তরে অবিনাশী গান।
ইতিহাসের দীপ্ত পাতায়, সংগ্রামের অন্তরায়,
উলগুলানের মহানায়ক— অমর হয়ে রয়।

লাল সালাম, বিরসা মুন্ডা।
বিনম্র শ্রদ্ধা, অরণ্যের অমর সন্তান।
—(উলগুলানের মহানায়ক,—সৈয়দ আমিরুজ্জামান)

উপসংহার

মাত্র পঁচিশ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে বিরসা মুন্ডা এমন এক ইতিহাস রচনা করেছেন, যা আজও সংগ্রামী মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস। তাঁর হাতে ছিল না আধুনিক অস্ত্র, ছিল না রাষ্ট্রক্ষমতা; কিন্তু ছিল জনগণের প্রতি গভীর আস্থা, ন্যায়বিচারের প্রতি অবিচল বিশ্বাস এবং স্বাধীনতার স্বপ্ন।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কামান-বন্দুক হয়তো তাঁর তীর-ধনুককে পরাস্ত করেছিল, কিন্তু পরাজিত করতে পারেনি তাঁর আদর্শকে। বিরসা মুন্ডা আজও বেঁচে আছেন ভূমির অধিকারের দাবিতে, বন রক্ষার আন্দোলনে, আদিবাসী জনগণের আত্মমর্যাদার সংগ্রামে এবং সকল নিপীড়িত মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষায়।

কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়—

“মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল
আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না।”

বিরসা মুন্ডার জীবন ও সংগ্রামও যেন সেই অঙ্গীকারেরই আরেক নাম—শোষণমুক্ত, মর্যাদাপূর্ণ এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার অবিরাম সংগ্রাম।

বিরসা মুন্ডার ১২৬তম শাহাদাৎ বার্ষিকীতে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

#
সৈয়দ আমিরুজ্জামান
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
বিশেষ প্রতিনিধি, সাপ্তাহিক নতুনকথা;
সম্পাদক, আরপি নিউজ;
কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;
সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, মৌলভীবাজার জেলা;
‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।
সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।
সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।
প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।
E-mail : syedzaman.62@gmail.com
WhatsApp : 01716599589
মুঠোফোন: ০১৭১৬৫৯৯৫৮৯

ShareTweetPin

সর্বশেষ সংবাদ

  • সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে রোহিঙ্গা যুবক নিহত
  • খাল নেই, তবুও সেতু নির্মাণ
  • নওগাঁয় ভ্যান চালক বেলাল হোসেনের উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের মাঝে কলম ও টিফিন বিতরণ
  • তুচ্ছ বিরোধের জেরে ছুরিকাঘাতে কি‌শো‌রের মৃত্যু
  • বিশ্বকাপে গোলবন্যা: ৭ থেকে ১০ গোল হজম করা ম্যাচের চিত্র

প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম
নির্বাহী সম্পাদক: মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ

বাংলা এফ এম , বাসা-১৬৪/১, রাস্তা-৩, মোহাম্মদিয়া হাউজিং লিমিটেড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ

ফোন:  +৮৮ ০১৯১৩-৪০৯৬১৬
ইমেইল: banglafm@bangla.fm

  • Disclaimer
  • Privacy
  • Advertisement
  • Contact us

© ২০২৬ বাংলা এফ এম

Welcome Back!

Login to your account below

Forgotten Password?

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.

Log In

Add New Playlist

No Result
View All Result
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • বিশ্ব
  • সারাদেশ
  • বিনোদন
  • খেলাধুলা
  • প্রবাস
  • ভিডিও
  • কলাম
  • অর্থনীতি
  • লাইফস্টাইল
  • ক্যাম্পাস
  • আইন ও আদালত
  • চাকুরি
  • অপরাধ
  • বিজ্ঞান প্রযুক্তি
  • ফটোগ্যালারি
  • ফিচার
  • মতামত
  • শিল্প-সাহিত্য
  • সম্পাদকীয়

© ২০২৬ বাংলা এফ এম