আল-জাজিরা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জাহাজ ট্র্যাকিং সংস্থার সর্বশেষ তথ্যমতে, ইরানের ওপর আমেরিকার কঠোর নৌ-অবরোধ বা ‘ব্লকেড’ থাকা সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালী দিয়ে নির্বিঘ্নে চলাচল করছে নিষেধাজ্ঞাভুক্ত জাহাজগুলো। আধুনিক রাডার ব্যবস্থা এবং মার্কিন যুদ্ধজাহাজের বিশাল বহরকে ফাঁকি দিয়ে ইরান যেভাবে এই অসাধ্য সাধন করছে, তা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, একটি দেশের উপকূল থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল (প্রায় ২২ কিমি) এলাকা সেই দেশের নিজস্ব জলসীমা। ইরান এই আইনি সুবিধাকেই সবচেয়ে বড় কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। ইরানি জাহাজগুলো একদম উপকূল ঘেঁষে চলাচল করায় মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো সেখানে প্রবেশ করতে পারছে না, কারণ ১২ মাইলের ভেতর ঢোকা মানেই সরাসরি ইরানের ওপর ‘আক্রমণ’ হিসেবে গণ্য হওয়া। এছাড়া উপকূলে মোতায়েন করা অ্যান্টি-শিপ মিসাইল এবং ড্রোনের হুমকির কারণে মার্কিন বাহিনী বাধ্য হয়ে গভীর সমুদ্রের আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবস্থান করছে। এই দূরত্বই ইরানি জাহাজগুলোর জন্য একটি নিরাপদ করিডোর তৈরি করে দিয়েছে, যা ব্যবহার করে তারা পাকিস্তান বা ভারত পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে।
প্রযুক্তিগতভাবে ইরান জাহাজগুলোর অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম বা ট্রান্সপন্ডার (AIS) পুরোপুরি বন্ধ করে দিচ্ছে। এর ফলে গ্লোবাল শিপিং ম্যাপে জাহাজগুলো শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। সাগরের হাজারো সাধারণ নৌকার ভিড়ে কোনটি পণ্যবাহী আর কোনটি তেলের ট্যাংকার, তা দূরপাল্লার রাডার দিয়ে বোঝা দুষ্কর। এছাড়া মাকরান উপকূলের দুর্গম পাহাড়ি খাঁড়িতে জাহাজগুলো লুকিয়ে থেকে মার্কিন ড্রোনের নজরদারি ফাঁকি দিচ্ছে। একবার জাহাজগুলো পাকিস্তান বা ভারতের জলসীমায় ঢুকে পড়লে সার্বভৌমত্ব এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের খাতিরে আমেরিকা সেখানে আর কোনো হস্তক্ষেপ করতে পারছে না।
পরিসংখ্যানও আমেরিকার এই ব্যর্থতার সাক্ষ্য দিচ্ছে। জাহাজ ট্র্যাকিং ডেটা অনুযায়ী, ১৩ এপ্রিল অবরোধ শুরুর পর থেকে ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত মোট ৬২টি জাহাজ সফলভাবে হরমুজ প্রণালী পার হতে পেরেছে। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস-এর রিপোর্ট বলছে, ১৩ থেকে ২২ এপ্রিলের মধ্যে অন্তত ৩৪টি ইরান-সংযুক্ত ট্যাংকার মার্কিন নজরদারি এড়িয়ে গেছে। এমনকি গত ২৪ ও ২৫ এপ্রিলেও ১১টি জাহাজ এই রুট দিয়ে চলাচল করেছে। অন্যদিকে খোদ মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড স্বীকার করেছে যে, তারা এই সময়ে মাত্র ৩১টি জাহাজকে বাধা দিয়ে ঘুরিয়ে দিতে পেরেছে। অর্থাৎ, মার্কিন অবরোধের চেয়ে ইরানের এই বহুমুখী কৌশলের সফলতার হার অনেক বেশি, যা এই মুহূর্তে আমেরিকাকে সমুদ্রপথে বেশ কোণঠাসা করে রেখেছে।

