মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৪ কোটি মানুষের একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী—কুর্দিরা—দীর্ঘদিন ধরেই নিজস্ব রাষ্ট্রের বাইরে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও তারা এখনো বিশ্বের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রহীন জাতিগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত। মধ্যযুগের বীর নেতা সালাহউদ্দিন আইয়ুবি-এর উত্তরসূরি এই জাতি বর্তমানে তুরস্ক, ইরান, ইরাক ও সিরিয়ার সীমান্তজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে ‘কুর্দিস্তান’ নামে পরিচিত এই অঞ্চলটি চারটি দেশের মধ্যে বিভক্ত। তুরস্ক-এ প্রায় ২ কোটি কুর্দি বাস করে, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য অংশ। ইরান-এ প্রায় ১ কোটি কুর্দি বসবাস করে, যেখানে তারা ধর্মীয়ভাবে সুন্নি ও শিয়া—উভয় ধারায় বিভক্ত। ইরাক-এ কুর্দিরা তুলনামূলকভাবে বেশি রাজনৈতিক সাফল্য অর্জন করেছে; ১৯৯১ সাল থেকে ‘কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকার’ গঠনের মাধ্যমে তারা আংশিক স্বায়ত্তশাসন ভোগ করছে। অন্যদিকে সিরিয়া-তে গৃহযুদ্ধের সময় ‘রোজাভা’ অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলেও সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনে তাদের অবস্থান এখন অনিশ্চিত।
কুর্দিদের রাজনৈতিক লক্ষ্য তিনটি প্রধান ধারায় বিভক্ত—পূর্ণ স্বাধীনতা, স্বায়ত্তশাসন এবং সাংস্কৃতিক অধিকার নিশ্চিত করা। ইরাকে আংশিক সফলতা এলেও তুরস্ক ও ইরানে তারা বহু সময় দমন-পীড়নের মুখে পড়েছে। সিরিয়ায় কুর্দি নেতৃত্বাধীন বাহিনী আইএসের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও রাজনৈতিক স্বীকৃতি এখনো অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
বিশ্ব রাজনীতিতে কুর্দিদের একটি বড় অভিজ্ঞতা হলো পরাশক্তির ওপর নির্ভরতার সীমাবদ্ধতা। আইএসবিরোধী যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-এর প্রধান মিত্র হলেও সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং ন্যাটো-র সদস্য তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার কৌশলগত কারণে কুর্দিদের স্বার্থ বারবার উপেক্ষিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কুর্দিদের ভবিষ্যৎ তিনটি সম্ভাবনার দিকে এগোচ্ছে। প্রথমত, সিরিয়ায় পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের পরিবর্তে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় যাওয়ার চেষ্টা। দ্বিতীয়ত, একক কোনো পরাশক্তির ওপর নির্ভর না করে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে কূটনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করা। তৃতীয়ত, ইউরোপ ও আমেরিকায় বসবাসরত প্রবাসী কুর্দিদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তোলা।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পমেয়াদে একটি স্বাধীন কুর্দিস্তান রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনা কম। তবে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় কুর্দিরা এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি, যাদের উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। তাদের ভবিষ্যৎ এখন ক্রমেই সামরিক সংঘর্ষের চেয়ে কূটনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে।

