নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত চাইনিজ মালিকানাধীন জাহাজ ‘রিচ স্ট্রে’ (Reach Stre) যেভাবে মার্কিন নাকের ডগা দিয়ে অবরোধ ভেঙে বেরিয়ে গেল, তা মূলত ওয়াশিংটনের সামরিক দম্ভের বেলুন ফুটো করে দিয়েছে।
২০২৩ সাল থেকে ইরানি তেল পাচারের দায়ে কালো তালিকাভুক্ত হওয়া এই জাহাজটির পলায়ন প্রমাণ করে যে, অবরোধের ঘোষণা দেওয়া যতটা সহজ, তা কার্যকর করা ততটাই কঠিন। সিএনএন-এ সাবেক মার্কিন নেভি অ্যাডমিরাল যে পরিসংখ্যান দিয়েছেন, তা থেকেই স্পষ্ট যে একটি কার্যকর নৌ-অবরোধের জন্য কত বিশাল বহর প্রয়োজন। হরমুজের বাইরে দুটি বিমানবাহী স্ট্রাইক গ্রুপ, ডজনখানেক জাহাজ এবং ভেতরে ছয়টি ডেস্ট্রয়ার—এই বিশাল আয়োজন সত্ত্বেও দিনে মাত্র ৬-৭টি জাহাজে তল্লাশি চালানো সম্ভব।
নৌ-অবরোধ মূলত একটি অত্যন্ত জটিল ‘চেকআপ’ প্রক্রিয়া। নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত জাহাজগুলো যেহেতু সামরিক নয়, তাই সরাসরি ডুবিয়ে দেওয়া যায় না। প্রতিটি জাহাজে উঠে তল্লাশি করা এবং সেগুলোকে বন্দরে নিয়ে যাওয়ার জন্য দক্ষ ‘বোর্ডিং টিম’ ও ডেক অফিসার প্রয়োজন, যার তীব্র সংকট বর্তমানে মার্কিন নৌবাহিনীর রয়েছে। হরমুজ প্রণালির সংকীর্ণ জলসীমায় আমেরিকার পর্যাপ্ত জাহাজ যেমন নেই, তেমনি যা আছে তাও প্রতিদিনকার হাজারো বাণিজ্যিক জাহাজের ভিড়ে সূঁচ খোঁজার মতো এক অসম্ভব কাজে নিয়োজিত।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ইরানের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া। আমেরিকার এই অবরোধ পরিকল্পনা ততক্ষণই কাগজে-কলমে কার্যকর, যতক্ষণ ইরান হাত গুটিয়ে বসে থাকবে। কিন্তু হরমুজ প্রণালির মতো ভৌগোলিক অবস্থানে ইরানের ‘অপ্রতিসম যুদ্ধকৌশল’ (Asymmetric Warfare) অত্যন্ত শক্তিশালী। ইরান যদি আক্রমণ শুরু করে, তবে এই সংকীর্ণ জলপথে আমেরিকান বিশাল জাহাজগুলো কেবল সহজ লক্ষ্যবস্তুতেই পরিণত হবে। তাছাড়া, আটক করা জাহাজগুলো যেসব বন্দরে রাখা হবে—সেটি ওমান হোক বা সংযুক্ত আরব আমিরাত—সেগুলোও নিমিষেই ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের নাগালে চলে আসবে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, নৌ-অবরোধ ঘোষণা করা মানেই হলো যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা, যার জন্য আমেরিকা সম্ভবত এখনো প্রস্তুত নয়।
নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্যমতে, ট্রাম্প প্রশাসনের ইরান যুদ্ধের পরিকল্পনায় কোনো ‘প্ল্যান বি’ না থাকাটাই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় ভুল। তারা ‘প্ল্যান এ’ বা প্রাথমিক আক্রমণ নিয়ে এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিল যে বিকল্প কোনো পরিস্থিতির কথা ভাবেনি। এখন যখন দেখা যাচ্ছে সেই পরিকল্পনা কেবল ব্যর্থই হয়নি বরং হিতে বিপরীত হয়েছে, তখন মার্কিন প্রশাসন অনেকটা হিস্টিরিয়াগ্রস্ত রোগীর মতো আচরণ করছে। ৩ বছর ধরে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা একটি জাহাজ যখন নির্বিঘ্নে অবরোধ ভেঙে বেরিয়ে যায়, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে আমেরিকার নৌ-অবরোধ বর্তমানে কেবল একটি ‘সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার’ বা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ছাড়া আর কিছুই নয়। তেহরান প্রমাণ করে দিয়েছে যে, সমুদ্রের নিয়ন্ত্রণ এখন আর এককভাবে ওয়াশিংটনের হাতে নেই।

