বাংলাদেশে শিশু রামিসা হত্যা ও ধর্ষণের নারকীয় ঘটনায় প্রধান আসামি সোহেল এবং তার স্ত্রী স্বপ্নার মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল মাত্র ১৯ দিনের মধ্যে (১৯ মে থেকে ৭ জুন ২০২৬) এই বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে রায় ঘোষণা করেছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, এই যুগান্তকারী রায় নিয়েও দেশের তথাকথিত ফেসবুক বিশেষজ্ঞ, এমনকি অনেক আইনের ছাত্র ও আইনজীবীদের একটি অংশ ‘ফেয়ার ট্রায়াল’ বা ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। তাদের মূল যুক্তি— এত দ্রুত বিচার হলে নাকি ফেয়ার ট্রায়াল নিশ্চিত হয় না, সঠিক বিচারের জন্য দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। আইনি ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতাকে যারা ন্যায়বিচারের মাপকাঠি মনে করেন, তাদের এই বিভ্রান্তি দূর করতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের একটি বিখ্যাত ও সফল আইনি নজিরের দিকে তাকানো প্রয়োজন।
২০০৪ সালের ১০ অক্টোবর সিঙ্গাপুরের পাসির পাঞ্জাং হোলসেল সেন্টার থেকে ৮ বছরের একটি চীনা মেয়ে ‘হুয়াং না’ নিখোঁজ হয়। অভিযুক্ত ছিল ২২ বছর বয়সী মালয়েশীয় নাগরিক টুক লেং হাও, যাকে মেয়েটি ‘চাচা’ বলে ডাকত। লুকোচুরি খেলার ছলে মেয়েটিকে স্টোররুমে নিয়ে সে যৌন নির্যাতন ও শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এরপর মরদেহ প্লাস্টিকে মুড়ে বাক্সে ভরে একটি পার্কে ফেলে দিয়ে সে মালয়েশিয়ায় পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে নিরুপায় হয়ে ৩০ অক্টোবর সে মালয়েশীয় পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করে। সিঙ্গাপুরের মতো বিশ্বের অন্যতম কঠোর ও উন্নত বিচারব্যবস্থায় এই হাই-প্রোফাইল মামলার মূল ট্রায়াল শুরু হয় ২০০৫ সালের ১১ জুলাই। অবাক করার মতো তথ্য হলো, মাত্র ১৪ দিনের ট্রায়ালে ৭৬ জন সাক্ষী, ভিডিও রি-এন্যাক্টমেন্ট এবং ফরেনসিক রিপোর্ট যাচাই করে জাস্টিস লাই কিউ চাই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন। আপিল ও রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা খারিজের পর ২০০৬ সালের ৩ নভেম্বর তার ফাঁসি কার্যকর হয়।
সিঙ্গাপুরের এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, একটি দক্ষ পুলিশি তদন্ত ও ফরেনসিক ব্যবস্থা থাকলে মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেও শতভাগ ‘ফেয়ার ট্রায়াল’ সম্পন্ন করা সম্ভব। আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা মানেই ন্যায়বিচার নয়, বরং অনেক সময় তা অপরাধীকে পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫(৩) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা হয়েছে, প্রতিটি আসামির ‘দ্রুত ও জনসমক্ষে’ বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। অর্থাৎ, দ্রুত বিচার কোনো আইনি বিচ্যুতি নয়, বরং এটি নাগরিকের একটি মৌলিক অধিকার।
রামিসা হত্যাকাণ্ডের দিকে তাকালে দেখা যায়, এটি কোনো রাজনৈতিক বা সাজানো মামলা ছিল না। এটি ছিল এক নির্মম, ঠান্ডা মাথার শিশু হত্যার ঘটনা। আসামি সোহেল ও তার স্ত্রী স্বপ্নাকে ঘরের মধ্যে হাতেনাতে ধরা হয়েছে, তাও খণ্ডিত মস্তকসহ। মেডিকেল টেস্টে ধর্ষণের প্রমাণ যাতে না পাওয়া যায়, সেজন্য খুনি সোহেল শিশুটির গোপনাঙ্গ চাকু দিয়ে কেটে পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলেছিল। গ্রেপ্তার হওয়ার পর বাঁচতে না পেরে তারা নিজেরাই বিজ্ঞ আদালতের কাছে ১৬৪ ধারায় দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে। আসামিপক্ষকে রাষ্ট্রীয় খরচে আইনজীবী দিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের সব সুযোগ দেওয়ার পরই এই রায় এসেছে।
যারা বাংলাদেশের এই ফাস্ট-ট্র্যাক ট্রাইব্যুনালের অসাধারণ গতি ও রায় নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন, তারা আসলে বাস্তবসম্মত আইনি ধারণার চেয়ে সস্তা ফেসবুক ভিউ বা অন্ধ বিরোধিতার সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত। দ্রুততা মানেই যে অন্যায় নয়, তা সিঙ্গাপুর বহু আগেই দেখিয়েছে, আর ২০২৬ সালে এসে বাংলাদেশও তা প্রমাণ করল। বিচারে প্রমাণের স্বচ্ছতা, সাক্ষীর সত্যতা এবং আসামির প্রতিরক্ষার সুযোগ অক্ষুণ্ন থাকলে দ্রুততম সময়ের বিচারই সমাজকে অপরাধমুক্ত করার সবচেয়ে বড় আশা জোগায়।

