মাসুদুর রহমান ইফতি
পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সুপারিশ ছাড়াই প্রশাসনের বিভিন্ন ক্যাডারে চাকরি পেয়েছেন অন্তত ৯৫ জন। দুর্নীতি দমন কমিশনের দীর্ঘ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া এই ৯৫ জন বছরের পর বছর ধরে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
দুদকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত ২৯, ৩০ ও ৩১তম বিসিএস নিয়োগে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই এসব নিয়োগ দেওয়া হয়। কোনো ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদও। ৯৫ জনের মধ্যে বেশিরভাগই নিয়োগ পেয়েছেন প্রশাসন ও পুলিশ ক্যাডারে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, সরকারের পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ দিতে ২০১২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় একটি বিধিবদ্ধ প্রবিধান আদেশ বা এসআরও জারি করে। এই আদেশের মাধ্যমে মেধাতালিকায় পিছিয়ে থাকা প্রার্থীদের মুক্তিযোদ্ধা কোটা দেখিয়ে নিয়োগের পথ খোলা হয়। দুদক বলছে, যারা কোটায় আবেদনই করেননি, তাদের নামেও তৈরি করা হয়েছে জাল সনদ।
সংশোধিত এসআরও অনুযায়ী, পিএসির সুপারিশকৃত প্রার্থীদের মধ্যে মেডিকেলে অনুপস্থিতদের স্থানে মুক্তিযোদ্ধা কোটা থেকে নিয়োগ দেওয়া যাবে। তবে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে নারী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা কোটার প্রার্থীদের। ২০১২ সালের এই এসআরও ২০০৮ সালের ২৮তম বিসিএস থেকে পরবর্তী সব পরীক্ষায় কার্যকর করার সিদ্ধান্ত হয়। এরপরই পিএসির সুপারিশ ছাড়াই নন-ক্যাডার থেকে প্রার্থী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমামের নির্দেশনা ও নেতৃত্বে এই অনিয়মের আয়োজন সম্পন্ন হয়। মূলত ২৯, ৩০ ও ৩১তম বিসিএসেই এই আইনের প্রয়োগ ঘটায় আওয়ামী লীগ সরকার।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ২৯তম বিসিএসে পিএসির সুপারিশে ২০১ সালের ১০ জুলাই ১৪৮০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর ১৩ মাস পর ২০১২ সালের ১২ আগস্ট আরও ২১ জন এবং পরে আরও ৮ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই ২৯ জনের কাউকেই পিএসি সুপারিশ করেনি। একইভাবে ৩০তম বিসিএসে ৩১ জন এবং ৩১তম বিসিএসে ৩৫ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে তিন বিসিএসে অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া ৯৫ জন পরবর্তী সময়ে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর এই ৯৫ জনের মধ্যে ৬৮ জনের বিস্তারিত তথ্য পেয়েছে দুদক।
২৯তম বিসিএসে অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া ২৯ জনের মধ্যে ২৭ জনের তালিকা পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে প্রশাসন ক্যাডারে সহকারী কমিশনার পদে নিয়োগ পেয়েছেন পাঁচজন— সাজিয়া আফরীন, আসমাউল হুসনা লিজা, মোছা. নাসরীন পারভীন, সুলতানা রাজিয়া ও মমতাজ বেগম। পুলিশ ক্যাডারে নিয়োগ পেয়েছেন দুজন— আছাদুজ্জামান ও মাহফুজা আক্তার শিমুল। এছাড়া আনসার, শুল্ক ও আবগারি, ইকোনমিক, কর, পরিবার পরিকল্পনা, পররাষ্ট্র ও সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে আরও ২০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
২৯তম বিসিএসের নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর আরও ছয়জনকে অবৈধভাবে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কোটায় নিয়োগ দেওয়ার প্রমাণ পায় দুদক। কোটায় আবেদন না করলেও জাল সনদ বানিয়ে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়। এই ছয়জনের বিরুদ্ধে চলতি বছরের জানুয়ারিতে মামলা করেছে দুদক। আসামিদের মধ্যে রয়েছেন প্রশাসন, পুলিশ, পরিবার পরিকল্পনা ও সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা।
২০১২ সালের ১৭ মে ৩০তম বিসিএসে ২৬১ জনকে নিয়োগ দেওয়ার পর পিএসির সুপারিশ ছাড়াই আরও ১৯ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে বিভিন্ন সময়ে আরও নিয়োগ দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে এই বিসিএসে অনিয়মের মাধ্যমে ৩১ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৮ জনের তালিকা পাওয়া গেছে। তালিকায় প্রশাসন, পুলিশ, আনসার, নিরীক্ষা ও হিসাব, শুল্ক ও আবগারি, পরিবার পরিকল্পনা ও তথ্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা রয়েছেন।
২০১২ সালের ২৭ ডিসেম্বর ৩১তম বিসিএসে ১৮১২ জনকে নিয়োগ দেওয়ার পরের বছরের ১২ জুন আরও ২৩ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর সংশোধিত এসআরও কাজে লাগিয়ে আরও ১২ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে এই বিসিএসে পিএসির সুপারিশ ছাড়া চাকরি পান অন্তত ৩৫ জন। এর মধ্যে ২৩ জনের তালিকা পাওয়া গেছে। ৩১তম বিসিএসে সবচেয়ে বেশি ১ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে প্রশাসন ক্যাডারে। পুলিশ ক্যাডারে রয়েছেন ছয়জন।
দুদকের অনুসন্ধানে হবিগঞ্জের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহফুজা আক্তার শিমুলের নামও উঠে এসেছে। ২৯তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে নিয়োগপ্রাপ্ত হিসেবে তার নাম রয়েছে তালিকায়।
অভিযুক্তদের কেউ কেউ অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ২৯তম বিসিএসের মমতাজ বেগম বলেছেন, তাদের নিয়োগ মেধার ভিত্তিতেই হয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব নেই। তবে আলাপের একপর্যায়ে তিনি স্বীকার করেন, অভিযুক্তদের অনেকে আবেদনে মুক্তিযোদ্ধা কোটা উল্লেখ না করলেও কোটায় নিয়োগ পেয়েছেন।
দুদক জানিয়েছে, দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকায় ইতিমধ্যে ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। বাকিদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অনুসন্ধান এখনও চলমান।

