সাতক্ষীরা প্রতিনিধি:
“জ্বালানি ঝুঁকির মুখে বাংলাদেশ” অস্থির বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে বিকল্প হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানীতে স্বনির্ভরতা অর্জনই সমাধানের লক্ষ্যে সাতক্ষীরায় সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বুধবার (২২ এপ্রিল) সাতক্ষীরা পরিবেশ উন্নয়ন ফোরামের আয়োজনে স্বদেশের নিজস্ব কার্যালয়ে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বক্তারা বলেন, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা ও মহাপ্রভাকেন্দ্রিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব সহলরাসরি এসে পড়ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তায়। যা সকল স্তরে উদ্বেষ সৃষ্টি করেছে, সৃষ্টি করেছে অস্থিরতা। এই বিষয়ে উদ্বেগে প্রকাশ করে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষন করেন এবং তা কার্যকর সমাধানের উপায় হিসাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের জন্য আহবান জানান।
আরো বলেন,বর্তমান ইরান যুদ্ধকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালীর অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের মতো আমদানি নির্ভর দেশের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বিভিন্ন স্তরের পেশাজীবি ও বিশেষজ্ঞদের সমন্নয়ে তুলানামূলক সাশ্রয়ী নীতি ঘোষনা, সংকট মোকাবেলায় অগ্রাধিকার ভিত্তিক কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহন, একই সাথে জ্বালানি সংকটের সময় বিকল্প জ্বালানি হিসাবে নবায়ানোযাগ্য জ্বালানী বিশেষ করে সৌরশক্তি ওপর বিশেষ গুরুত্ব প্রধান করে কৌশলগতভাবে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবি জানানো হয়।
বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা স্বদেশ, ক্লিন এবং বিডব্লিউব্লিইডি এর সহযোগিতায় প্রতিবেশ ও উন্নয়ন ফোরাম সাতক্ষীরার পক্ষে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন স্বদেশ’র নির্বাহি পরিচালক ও জেলা প্রতিবেশ ও উন্নয়ন ফোরামের সদস্য সচিব মাধব চন্দ্র দত্ত।এসময় উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রতিবেশ ও উন্নয়ন ফোরামের সভাপতি বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সাবেক অধ্যক্ষ মো. আব্দুল হামিদ প্রমুখ।
মাধব চন্দ্র দত্ত লিখিত বক্তব্যে বলেন, দেশের দক্ষিন অঞ্চলে জ্বালানী তেল ও প্রেট্রোলের অভাব দৃঢ়ভাবে প্রকট। বৈশ্বিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান থেকে আমদানিকৃত জ্বালানিয় ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে সরাসরি সরবরাহ সংকটে পড়ে। ইতোমধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, মূল্যস্ফীতি এবং আমদানি ব্যয়ের ওপর এর চাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের শুরুতেই জ্বালানি আমদানি বায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়ায়েজ, যা টাকার মান কমানো এবং মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় গত এক দশকে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় আমদানিকৃত এলএনজি, এলপিজি ও পেট্রোলিয়ামের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। বর্তমানে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল, ৬৫ শতাংশ এলএনজি এবং অর্ধেকের বেশি এলপিজি হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল। ফলে ওই অঞ্চলে যেকোনো উত্তেজনা সরাসরি জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব ফেলে।
বর্তমানে দক্ষিন অঞ্চলে জ্বালানী সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার বড় অংশ অচল হয়ে পড়ছে। ১০টির মধ্যে ৬টি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। শিল্প উৎপাদন কমছে, পরিবহন খরচ বাড়ছে এবং কৃষি ও মৎস্যতে সেচব্যবস্থা বিঘ্নিত হচ্ছে। জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হলে তা সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা আসবে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানান তারা।
প্রতিবছর আমদের জ্বালানি আমদানিতে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি বাড়ছে। ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর পর থেকে বাংলাদেশ একটি ব্যয়বহুল জ্বালানি কাঠামোর মধ্যে আটকে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের অস্থিরতা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতোমধ্যে এলএনজি ও তেলের দাম কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয়ও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে বিকল্প হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর আমাদের স্বনির্ভরতা অর্জন করতে হবে। ফিলিপাইন, পাকিস্তানের সৌরবিদ্যুৎ বিপ্লব একটি কার্যকর উদাহরণ, যেখানে স্বল্প সময়ে ব্যাপক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করে আমদানি নির্ভরল কমানো সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশেও প্রায় ৪ কোটির বেশি পরিবারের একটি বড় অংশ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডের উপর চাপ কমাতে পারে। তাদের মতে, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে কয়েক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব যা জ্বালানি আমদানি কমানোর পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি ভবন এবং কৃষিখাতে সৌরশক্তি ব্যাবহারের মাধ্যমে আরও বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।
এছাড়া জ্বালানি সংকট সমাধানে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির যন্ত্রপাতির আমদানিতে কর ও ভ্যাট প্রত্যাহার, সরকারী-বেসরকারী ভবনে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ কর্মসূচি বাস্তবায়ন, কৃষি কাজে সৌরচালিত সেচ পাম্প বৃদ্ধি, গণপরিবহনে বৈদ্যুতিক যান চালু এবং নবায়নযোগ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য স্বল্প সুদে ঋনের হার বাড়ানো। এছাড়া জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কাঠামো পুনর্বিন্যাস এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে গুরুত্ব দেওয়ারও সুপারিশ করা হলো।

