রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারকে (৮) ধর্ষণের পর নৃ শংসভাবে গলা কেটে ও খণ্ড-বিখণ্ড করে হত্যার আলোচিত মামলায় আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের মৃত্যুদণ্ডের রায়ে আপাতত সন্তোষ প্রকাশ করেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। উচ্চ আদালতে গেলেও এই দৃষ্টান্তমূলক রায় বহাল থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তিনি।
রোববার (৭ জুন) দুপুরে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের কাছে এ মামলার রায়ের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে আইনমন্ত্রী এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
আইনমন্ত্রী তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “আমরা আপাতত সন্তুষ্ট। আশা করি, এটা উচ্চ আদালতে গেলেও এই রায় কার্যকর থাকবে”। তিনি আবেগঘন কণ্ঠে আরও বলেন, “আমরা রামিসাকে তার বাবা-মার কাছে ফিরিয়ে দিতে পারবো না। কিন্তু আমাদের যতটুকু করার সেটা আমরা করার চেষ্টা করেছি। মাত্র ছয় কার্যদিবসের মধ্যে আমরা রামিসার মত এরকম বেদনাদায়ক একটি ঘটনার বিচার করতে সক্ষম হয়েছি। এটা বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম”।
এর আগে, রোববার সকালে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন আলোচিত এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি আদালত আসামি সোহেলকে ৫ লাখ টাকা এবং তার স্ত্রী স্বপ্নাকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করে। এই অর্থদণ্ডের পুরো টাকা ভিকটিম মৃত রামিসার আইনগত উত্তরাধিকারী পাবেন বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়। আদালত নির্দেশ দিয়েছে, আসামিরা ক্ষতিপূরণ না দিলে তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে রামিসার পরিবারকে সেই টাকা পরিশোধ করা হবে।
রায় ঘোষণা উপলক্ষে আজ সকালে কড়া নিরাপত্তায় মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানাকে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ঢাকার আদালতে হাজির করা হয়। এর আগে গত বৃহস্পতিবার (৪ জুন) মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রায়ের জন্য আজকের দিন ধার্য করেছিলেন আদালত।
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, নিহত রামিসা পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সে নিজের ঘর থেকে বের হলে প্রতিবেশী ভাড়াটিয়া স্বপ্না আক্তার তাকে কৌশলে নিজের কক্ষে ডেকে নিয়ে যায়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে পাঠানোর জন্য তার মা খোঁজখুঁজি শুরু করেন এবং একপর্যায়ে আসামিদের কক্ষের সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পান।
ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে রামিসার বাবা-মা ও ভবনের অন্যান্য বাসিন্দারা দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করতেই শিশুটির বীভৎস ও খণ্ড-বিখণ্ড মরদেহ দেখতে পান। পরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে স্বপ্নাকে হেফাজতে নেয় এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে মূল ঘাতক সোহেল রানাকে গ্রেফতার করে। এই ঘটনায় ২০ মে রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন।
বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এই মামলার দ্রুততম বিচারিক প্রক্রিয়া একটি অনন্য নজির স্থাপন করেছে:
২০ মে: রামিসার বাবা মামলা করার পর প্রধান আসামি সোহেল রানা (৩০) আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দেয় এবং তার স্ত্রী স্বপ্নাকে (২৬) কারাগারে পাঠানো হয়।
২৪ মে: মাত্র ৫ দিনের মাথায় তদন্ত শেষ করে পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন এবং ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন তা আমলে নেন।
১ জুন: ট্রাইব্যুনাল আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (চার্জ) গঠন করে।
১ থেকে ৪ জুন: মাত্র ৪ দিনে চার্জশিটভুক্ত ১৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের জবানবন্দি ও জেরা সম্পন্ন করে চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক শেষ করা হয়।
৭ জুন: মামলার রায় ঘোষণা।
নৃশংসতম এই হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্রপক্ষ ও আদালতের অভাবনীয় তৎপরতায় মাত্র ৬ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করে আজ এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করা হলো।

