মুহাম্মদ আল্-হেলাল
মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা চলাকালীন শহীদ আবদুল মালেক বাবা হারান। পরীক্ষারকারণে তাঁকে বিষয়টি জানতে দেয়া হয়নি। ২ দিন পর তাঁর বড় ভাই আব্দুল বারী দেখা করতে গেলেন তার সাথে। পরীক্ষার খোঁজ খবর নেয়ার পর আবদুল মালেকও বাড়ির খোঁজ জানতে চাইলেন। বড় ভাই কৌশলে জানালেন যে, উপস্থিত সবাই ভালো আছেন। ১৯৬৯ সালে শহীদ আবদুল মালেকসহ ১০ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল পাকিস্তানের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী এয়ার মর্শাল নুর খানের সাথে সাক্ষাৎ করে দেশে সর্বজনীন ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা চালুর দাবি করেন। শহীদ আবদুল মালেকের প্রতিনিধিদলের পর দেশের অন্যান্য সংগঠনও একই দাবি তোলেন। সবার দাবির মুখে অল্প কিছুদিনের মধ্যে সরকার নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়নের লক্ষ্যে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করে এবং কমিশন একটি শিক্ষানীতিও ঘোষণা করে। ঘোষিত শিক্ষানীতিতে কিছু ত্রুটি বিচ্যুতি থাকলেও এতে ইসলামী আদর্শের প্রাধান্য পরিলক্ষিত হয়।
কিন্তু ইসলামবিদ্বেষী চক্রের কাছে পছন্দ হয়নি। তারা এ শিক্ষানীতি বাতিলের দাবি জানায়। এমনই প্রেক্ষাপটে শিক্ষাব্যবস্থার আদর্শিক ভিত্তি কী হবে তা নিয়ে জনমত জরিপের আয়োজন করা হয়। জনমত জরিপের অংশ হিসেবে ১৯৬৯ সালের ২ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নিপা) ভবনে (বর্তমান ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ) এ শিক্ষানীতির ওপর একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই আলোচনা সভায় বামপন্থীদের বিরোধিতামূলক বক্তব্যের মধ্যে শহীদ আবদুল মালেক মাত্র ৫ মিনিট বক্তব্য রাখার সুযোগ পান। অসাধারণ মেধাবী বাগ্মী শহীদ আবদুল মালেকের সেই ৫ মিনিটের যৌক্তিক বক্তব্যে উপস্থিত সবার চিন্তার রাজ্যে এক বিপ্লবী ঝড় সৃষ্টি করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র আবদুল মালেক সে সময়ে জাতির বৃহত্তর কল্যাণকে সামনে রেখে সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থার অবশ্যম্ভাবী পরিণতিকে উপলব্ধি করেছিলেন। একজন দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মানুষ হিসেবে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন সমাজতন্ত্র, পুঁজিবাদ কিংবা আধুনিকতা দ্বারা প্ররোচিত হয়ে নৈতিকতাহীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তিত হলে সমাজে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের সাথে সাথে স্বকীয় ভাষা-সংস্কৃতির নির্বাসন হবে। তাই তার বক্তব্যের এ ধারণাটিকে তিনি যুক্তি সহকারে খুব সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছিলেন।
তিনি বক্তব্যে Common set of cultural values এর ধারণা উত্থাপন করে এর সুন্দর ব্যাখ্যা ও যুক্তি দাঁড় করিয়েছিলেন। তিনি বলেন, এর মানে One set of cultural values নয়, One set of cultural values সোভিয়েট ইউনিয়নে রয়েছে, যেখানে রয়েছে একটি Authoritarian society আর সেখানে বিভিন্ন অঙ্গরাষ্ট্রগুলো তাদের Culture-কে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দিয়ে সেখানে একটা One set of cultural values তৈরি করেছে। আমরা এটার বিরোধী। আমরা এখানে চাই Common set of cultural values not one set of cultural values. ফলে সভার মোটিভ পুরোপুরি পরিবর্তন হয়ে যায়। উপস্থিত শ্রোতা, সুধীমণ্ডলী এবং নীতি নির্ধারকরা শহীদ আবদুল মালেকের বক্তব্যের সাথে ঐকমত্য পোষণ করে একটি সর্বজনীন ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষে মত দেন।
নিপার আলোচনা সভায় তাদের শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষে জনমত তৈরিতে ব্যর্থ হওয়ার পর হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য ডাকসুর নামে ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষার পক্ষে প্রস্তাব পাস করানোর উদ্দেশ্যে ১২ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে এক আলোচনা সভার আয়োজন করে। শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে শহীদ আবদুল মালেকসহ কয়েকজন ইসলামী শিক্ষার ওপর কথা বলতে চাইলে তাদের সুযোগ দেয়া হয়নি। সভার এক পর্যায়ে কোন একজন ইসলামী শিক্ষার প্রতি কটাক্ষ করে বক্তব্য রাখে। তখন উপস্থিত শ্রোতারা এর তীব্র বিরোধিতা করে ইসলামী শিক্ষার পক্ষে শ্লোগান দেয়। সাথে সাথেই ইসলামী শিক্ষার বিরোধী পক্ষ হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে সাধারণ ছাত্রদের ওপর। সন্ত্রাসীদের ছোবল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আবদুল মালেক তার সাথীদের স্থান ত্যাগের নির্দেশ দেন।
এ সময় সকল সঙ্গীকে নিরাপদে বিদায় দিয়ে আবদুল মালেক ২-৩ জন সাথীকে সাথে নিয়ে টিএসসির পাশ দিয়ে তার হলে ফিরছিলেন। হলে ফেরার পথে লোহার রড-হকিস্টিক নিয়ে সন্ত্রাসীরা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে তাকে রেসকোর্স ময়দানে বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিয়ে ইটের ওপর মাথা রেখে ইট ও লোহার রড- হকিস্টিক দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করে রক্তাক্ত ও অর্ধমৃত অবস্থায় ফেলে রেখে চলে যায়। তাঁর সঙ্গী গাজী ইদ্রীসও মারাত্মকভাবে আহত হন। আবদুল মালেককে আহত এবং অজ্ঞান অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু তিনি আর ফিরে আসেননি মায়ের কোলে। ১৫ আগস্ট শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করে সেই আব্দুল মালেক আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যান তিনি। (প্রফেসর মাহফুজুর রহমান আখন্দ-ইসলামেরইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়)
ঘটনাটির দুই দশক পরে সালমান আজমীকে শুধু বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা আমীর অধ্যাপক গোলাম আযমের সন্তান হওয়ায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার আগেই ক্যাম্পাস ছাড়তে হয়। পরবর্তীতে তিনি ইন্ডিয়ার আলীগড় মুসলীম বিশ্ববিদ্যালয়ে লিঙ্গুইস্টিক্স থেকে পড়াশোনা করেন যেটি তার বড় ভাই ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমান আযমীর পোস্ট থেকে জানা যায়। (আমার দেশ; সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৫)
এই ঘটনার প্রায় ৫ বছরের মাথায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ ক্যাম্পাস ছাত্রদলের সন্ত্রাসীদের নৃশংস নির্যাতনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ার পূর্বেই ছাত্রশিবির কর্মী কামরুল ইসলামের রক্তে সিঞ্চিত হওয়ার ঘটনাটি শেয়ার করা বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ফেইসবুক পেইজে।
১৯৯৪ সালের আগস্ট মাসে ছাত্রশিবির কর্মী কামরুল ইসলাম পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ এর জন্যে তার একজন নিকটত্মীয়ের নিকট মওলানা ভাসানী হলে ১৪৫ নং কক্ষে ওঠেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজী, অমায়িক শান্ত ভদ্র শহীদ কামরুল যখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ ক্যাম্পাসে পদার্পণ করেন, তখনো তিনি জানেন না এই ক্যাম্পাস হলগুলো তখন ধার্মিক মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য এক ভয়াল হিংস্র জনপদ। নামাজ রোজা সালাম প্রভৃতি ইসলামী সংস্কৃতির লালন তখন সেখানে কার্যত নিষিদ্ধ। শৈশব থেকেই নামাজী কামরুল ১৬ আগস্ট যখন মাগরিবের নামাজ হলের মসজিদে পড়েন তখনি ছাত্রদলের কুখ্যাত সন্ত্রাসীদের নজরে পড়েন। এক্ষেত্রে তাদের সহায়তা করে অন্ধকারে জীবন পতিত সমাজতন্ত্রের ধ্বজাধারী ছাত্রফ্রন্ট ও ছাত্র ইউনিয়নের কাপুরুষ সন্ত্রাসীরা।
সন্ধ্যা ৭ টার দিকে কামরুল ইসলাম ভাইকে ১৪৫ নং কক্ষ থেকে ছাত্রদলের কুখ্যাত সন্ত্রাসী দীপুর ৩৩২ নং কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। ছাত্রদলের কুখ্যাত সন্ত্রাসীদের নেতৃত্বে সে কক্ষে রাতভর নির্যাতন চালানো হয়। কামরুল ইসলামকে শিবির কর্মী সন্দেহে কিল, ঘুষি ও লাথি দিয়ে মেঝেতে ফেলে দেয়া হয়। পরে তার পকেটে শিবিরের ডায়েরি দেখে নিশ্চিত হয়ে নির্মম নির্যাতনে জর্জরিত করে। সন্ত্রাসীরা অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় লাঠি, বড় পেপসির বোতল ও অন্যান্য ধারাল অস্ত্রে উপর্যুপরি আঘাতে তার মাথা ও শরীরে ক্ষত বিক্ষত করে। তার আর্ত চিৎকারে চারদিক প্রকম্পিত হলেও সন্ত্রাসীদের ভয়ে কেউ সাহায্যের জন্যে এগিয়ে আসতে সাহস পায়নি। কামরুল ইসলামের আর্তচিৎকার যেন বাইরে থেকে না শোনা যায়, এজন্য তার মুখে কাপড় গুঁজে দেয় খুনি হায়েনার দল। সারারাত ধরে পালাক্রমে পাশবিক নির্যাতন চালিয়ে কামরুল ইসলামের হাত ও চোয়াল ভেঙে দেয় ছাত্রদলের শিক্ষার্থী নামধারী সন্ত্রাসীরা।
পিপাসায় কাতর হয়ে “আল্লাহ গো! বাঁচাও! পানি পানি!” বলে চিৎকার করলেও ওরা তাকে সারারাত একফোঁটা পানিও খেতে দেয়নি বরং তার মুখে প্রস্রাব করে দেয়। তারপর তাকে নির্যাতন করা হয়নি এই বলে মুচলেকা দিতে বাধ্য করে। সারারাত নির্যাতনের পর ১৭ই আগস্ট ১৯৯৪ সকালে মওলানা ভাসানী হলের দুজন কর্মচারী শফিক ও বাবুলকে দিয়ে মুমূর্ষু কামরুল ইসলামকে বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসা কেন্দ্রে পাঠিয়ে দিলে কর্তব্যরত ডাক্তার তার অবস্থা মারাত্মক দেখে ঢাকা মেডিক্যালে নেয়ার জন্য পরামর্শ দেন। সন্ত্রাসীরা এই অবস্থায়ও পাশবিকতা থামায় নি, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করতে না দেয়ায় বেবিটেক্সিযোগে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার পর সাভার লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের নিকট যাওয়ার পরপর কামরুল ইসলাম মহান আল্লাহর দরবারে সাড়া দিয়ে জান্নাতের পথে পাড়ি জমান। (ইন্নালিল্লাহী ….. রাজিউন)
অবস্থা বেগতিক দেখে তারা ঢাকার দিকে না গিয়ে ক্যাম্পাসে ফিরে আসার সময়নওয়াব ফয়জুন্নেসা হলের পূর্বে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে তার লাশ ফেলে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। পরে সাভার থানা পুলিশ খবর পেয়ে লাশ ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে আসলে ঢাকা মহানগরীর সাথীরা লাশ গ্রহণ করে। মজলুমের আহাজারি আজও থামেনি জাহাঙ্গীরনগরে, হয়নি শহীদ কামরুল ভাইয়ের বিচার। এ ক্যাম্পাসে পাখি হত্যা করলেও যেখানে শাস্তির বিধান হতো, কিন্তু শিবির হত্যার বিচার কখনো মুখ্য ছিলোনা।
সাম্প্রতিক বিগত আওয়ামী সরকারের প্রথমদিকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতেও প্রায় তল্লাসী চলত, ভিন্নমত পোষণ করলে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে শিবির ট্যাগ দিয়ে শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের সহকারি অধ্যাপক শেহরিন আমিন মোনামী ম্যাডাম ডাকসু নির্বাচনে অন্যায় কাজে বাধা সৃষ্টি করায় তাকেও বিভিন্ন মিডিয়ায় একই কায়দায় জামায়াত শিবির ট্যাগ দেওয়া হয়। এমন সময় আমার এক বন্ধু যে বর্তমানে ইউরোপে থাকে আমাকে একটি ইংলিশ ভার্সনের কুরআন দিয়েছিল। আমি কুরআনটি কি করব বুঝে উঠতে পারছিলামনা। এক পর্যায়ে রাতে হলে তল্লাশির খবর শুনে আল্-বিরুনি হলের ছাদ থেকে আল্-বিরুনি হল এবং ফজিলাতুন্নেসা মুজিব হলের মধ্যে যে লেক আছে সেখানে ফেলে দিয়েছিলাম। যদিও এটি মুসলিম রাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয় যার পূর্ব নাম ছিল জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়। জানিনা আল্লাহ আমাকে এহেন কাজের জন্য ক্ষমা করবেন কিনা? তবে এই ঘটনার মাধ্যমে এটি অনুমেয় তৎকালীন ক্যাম্পাসগুলোতে মুসলিম ধার্মিক শিক্ষার্থীদের কেমন পরিস্থিতি ছিল। এমনই এক তল্লাশিতে তৎকালীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে তল্লাশি চলাকালে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন কর্তৃক এক হিন্দু শিক্ষার্থীকে জঙ্গি আখ্যা দেওয়ার বিষয়টিও মিডিয়ায় বেশ আলোচিত হয়। মহান আল্লাহর ইচ্ছায় আজ সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ যথাক্রমে ডাকসু, জাকসু নির্বাচনে মুসলিম ধার্মিক শিক্ষার্থী দূরকিবাৎ ইসলামী রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের ভূমিধ্বস বিজয় হয়েছে।
এতো গেল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মুসলিম ধার্মিক শিক্ষার্থীদের সাথে ঘটে যাওয়া বৈষম্যের কিছু খন্ড চিত্র। এবার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ডের এক চাকরিপ্রত্যাশীর কয়েকটি অভিজ্ঞতার চিত্র।
তিনি একটি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পদের জন্য প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় পাশ করার পর খুব ভালো লিখিত পরীক্ষা দেন কোন ভাবেই ফেইল করার কথা নয়। কিন্তু তাকে পাশ করানো হয়নি। ফলে তিনি ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ে মানবসম্পদ বিভাগে পরীক্ষার খাতা দেখার জন্য যোগাযোগ করেন। প্রথমে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা খাতা দেখানোর একটি ডেইট দিলেও পরবর্তীতে টালবাহানা করে আর খাতা দেখাননি। আবার সরকারী টেলিটক কোম্পানিতে সহ ব্যবস্থাপক পদের জন্য প্রিলিমিনারি, লিখিত পরীক্ষা দিয়ে ভাইবা বোর্ডে যান সেখানে শুধু এই চাকরি প্রত্যাশীর টাই নিয়ে আলোচনা করেই তাকে বিদায় দেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সহকারি পরিচালক পদের জন্যেও প্রিলিমিনারি, লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভাইবা দিতে গেলে এই চাকরিপ্রত্যাশীকে তৎকালীন আলোচিত আইএসআই সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করায় তিনি অনেক সুন্দরভাবে তথ্যবহুল করে উত্তর দেন যেটি হয়তো ভাইভা বোর্ডের সংশ্লিষ্ট এক্সপার্টও প্রত্যাশা করেননি। এমনকি বাইরে থেকে সংশ্লিষ্ট বিষয় পড়াশোনা করা আরো কয়েকজন চাকরি প্রত্যাশী ঐ প্রার্থীকে বলেন আপনি অনেক সুন্দর ভাইবা দিয়েছেন। আপনার চাকরি হবে ইনশাআল্লাহ। উল্লেখ্য উক্ত ভাইবা প্রার্থী একজন এমফিল গবেষক এবং ঐ ভাইবার ২/১ দিন আগে জিজ্ঞাসিত বিষয়টির উপর তাদের প্রেজেন্টেশন ছিল। কিন্তু ফলাফল প্রকাশের পর দেখা গেল ঐ প্রার্থীর পাশের গ্রামের একজন আওয়ামী লীগ নেতার ভাতিজার চাকরি হয়েছে।
সেসময় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন জনাব শামীম আফজাল। বিষয়গুলো নিয়ে একজনের সাথে ঐ প্রার্থী কথা বললে তিনি জানান জনাব শামীম আফজালের ঘনিষ্ঠ সূত্র থেকে জানা গেছে বর্তমান সরকারের পক্ষ মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ডের কাউকে কোন ঊর্ধ্বতন পদে নিয়োগ দেওয়া মৌখিক ভাবে নিষেধ আছে। সাম্প্রতিক বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ডের কাউকে কোন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এমন কোন খবর আমারও জানা নেই।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হত্যা রাহাজানি, হেনস্থা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যত বৈষম্য হয়েছে সমস্ত কিছুর সুষ্ঠু বিচার করা বর্তমান অন্তবর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব।

বিশিষ্ট গবেষক এবং কলামিস্ট

