ভূ-রাজনীতিতে কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়—এই চরম সত্যটি মধ্যপ্রাচ্যের জলবায়ুতে এখন আরও বেশি স্পষ্ট। ১১ বছর আগে ২০১৫ সালে যখন অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় ইরানের পরমাণু চুক্তি (JCPOA) স্বাক্ষরিত হচ্ছিল, তখন দৃশ্যপট ছিল ভিন্ন। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার বোম মেরে উড়িয়ে দেওয়ার হুমকির মুখে একরকম বাধ্য হয়েই ইরানকে টেবিলে বসতে হয়েছিল।
কাকতালীয়ভাবে, সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে ভিয়েনায় উপস্থিত থেকে যে উত্তাপ টের পেয়েছিলাম, আজ ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে বসে ইউরোপের শীর্ষ ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকদের মুখে তার সম্পূর্ণ উল্টো সুর শুনছি। তাঁদের সবার মুখে এখন একটিই অমোঘ সত্য উচ্চারিত হচ্ছে—’ইরান এই যুদ্ধে জিতে গেছে।’ আর এর সমান্তরালে ধ্বনিত হচ্ছে ওয়াশিংটনের সাম্রাজ্যবাদী দম্ভের অবসানকাল।
পরিস্থিতি কতটা নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে, তা গত ৪৮ ঘণ্টার ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলেই স্পষ্ট হয়। ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের করমর্দনের মধ্য দিয়ে যখন একটি বহুপ্রত্যাশিত শান্তিচুক্তি প্রায় চূড়ান্ত হওয়ার পথে, ঠিক তখনই সেই আলোয় জল ঢেলে দিলেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ট্রাম্পের মিত্র হিসেবে পরিচিত নেতানিয়াহু নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টেকাতে লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণ অংশে—যা দাহিয়া অঞ্চল নামে পরিচিত—একটি ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী হামলা চালিয়ে বসলেন। অথচ মাত্র এক সপ্তাহ আগেই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি স্পষ্ট ঘোষণা করেছিলেন, দক্ষিণ বৈরুত ইরানের জন্য একটি অলঙ্ঘনীয় ‘রেড লাইন’। নেতানিয়াহু ঠিক এই রেড লাইনটিই অতিক্রম করেছেন, যাতে কোনোভাবেই ট্রাম্পের শান্তিচুক্তি সফল হতে না পারে।
নেতানিয়াহুর এই ঔদ্ধত্যের পর মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য মার্কিন হাত থেকে কতটা ফসকে গেছে, তা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যেই প্রমাণিত। ফক্স নিউজকে ট্রাম্প চরম অসহায়ত্বের সুরে বলেছেন, “আমি ইরানকে অনুরোধ করব যাতে লেবাননে হামলার জবাবে তারা ইসরায়েলে পাল্টা আঘাত না করে।” যে পরাশক্তি একসময় মধ্যপ্রাচ্যে হুকুম জারি করত, সেই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আজ প্রকাশ্যে ইরানকে ‘রিকোয়েস্ট’ করছেন! এই একটি বাক্যই প্রমাণ করে, যুদ্ধের বল এখন কার কোর্টে। ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আক্ষেপ করে লিখেছেন, এমন এক সময়ে এই হামলা হওয়া উচিত হয়নি যখন ইরানের সাথে চুক্তি প্রায় হাতের মুঠোয়। এর জবাবে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মারান্ডি যে তীক্ষ্ণ প্রশ্নটি ছুড়ে দিয়েছেন তা বেশ যৌক্তিক—”তাহলে কি চুক্তি হয়ে যাওয়ার পর ইসরায়েল হামলা করবে?” একই সুর মার্কিন সামরিক বিশেষজ্ঞ অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল ম্যাকগ্রেগরের কণ্ঠেও; তাঁর মতে, ইসরায়েলকে থামাতে না পারলে এই চুক্তির কোনো কার্যকারিতা নেই।
এখন প্রশ্ন উঠছে, ইরান কি আজ রাতেই ইসরায়েলের ওপর পাল্টা হামলা চালাবে, নাকি ট্রাম্পের অনুরোধ রক্ষা করবে? স্কাই নিউজের সামরিক বিশেষজ্ঞের কথায়, “ইরান কেন ট্রাম্পের কথা শুনবে, যেখানে ট্রাম্পের নিজের বন্ধু নেতানিয়াহুই তাঁর কথা শুনছে না?” ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন বলছে, ইরান প্রস্তাবিত মার্কিন ফ্রেমওয়ার্ক নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। অর্থাৎ, তেহরান এখন তাড়াহুড়ো করার পক্ষে নয়, তারা পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে চাল চালছে। সাধারণত ইরান যা মুখে বলে, তা কাজে বাস্তবায়ন করে; ফলে দাহিয়ায় হামলার শোধ তারা নেবে না—এমনটা ভাবা বোকামি। তবে এই সংঘাতের সমান্তরালে চলতি সপ্তাহের যেকোনো দিন চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হওয়াও অসম্ভব নয়।
আমেরিকা ও ইসরায়েল আসলে এই যুদ্ধে অনেক আগেই হেরে বসে আছে। স্কাই নিউজের সামরিক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মাইকেল ক্লার্কের সেই অমোঘ বিশ্লেষণটি মনে করিয়ে দেওয়া দরকার—”আমেরিকা এপ্রিলের ৮ তারিখেই এই যুদ্ধে হেরে গেছে।” ৩৯ দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ইসরায়েল ও আমেরিকা মিলে ইরানের ওপর প্রায় ৪০ হাজার বোমা বর্ষণ করেছে। কিন্তু এত বিপুল ধ্বংসযজ্ঞের পরও তারা ইরানকে নতজানু করতে পারেনি। বাধ্য হয়ে যখন ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, পরাজয়ের দলিল তখনই লেখা হয়ে গিয়েছিল।
গত ১১ বছরে ইরান প্রযুক্তিতে, বিশেষ করে ড্রোন ও মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমে যে অভাবনীয় উন্নতি করেছে, তা এই ৪০ হাজার বোমা হজম করার পরও মাথা উঁচু করে টিকে থাকার শক্তির উৎস। ইরান এখন বুঝে গেছে—বোমা মেরে তাদের দমানো অসম্ভব। আর যখন কোনো জাতি তার এই অপরাজেয় আত্মশক্তিকে চিনে ফেলে, তখন পৃথিবীর কোনো পরাশক্তিই তাকে আর আটকে রাখতে পারে না। ডেনমার্কের কনফারেন্সে উপস্থিত ইউরোপের নামকরা বিশ্লেষকদের অভিন্ন সুরও এটাই নির্দেশ করছে। মধ্যপ্রাচ্য হয়তো একটি বড় সমঝোতার দিকে যাবে, নয়তো নতুন সংঘাতের আগুনে পুড়বে—যার জন্য আমাদের আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে। তবে একটি বিষয় এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট: পরাশক্তি আমেরিকার আধিপত্যের দিন ফুরিয়ে এসেছে এবং মার্কিন সাম্রাজ্যের পতন এখন কেবলই সময়ের ব্যাপার।

