আমাদের এই জনপদে কিছু মানুষের জীবন যেন কেবলই পরিসংখ্যানের অংশ। বিশেষ করে যারা দ্বীনি শিক্ষার মশালে আলো জ্বালায়, সেই মাদ্রাসা ছাত্রদের ওপর যুগ যুগ ধরে যে পদ্ধতিগত নিপীড়ন চলে আসছে, তা আজ ইতিহাসের এক নির্মম অধ্যায়।
২০১৩ সালের সেই ৫ই মে, শাপলা চত্বরের সেই কালো রাতটি আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেছে যে, এ দেশে টুপি-দাড়ি আর পাঞ্জাবি পরা মানুষের জীবনের মূল্য কতটা সস্তা হতে পারে। রাতের অন্ধকারে যখন হাজারো তৌহিদী জনতার ওপর নির্বিচারে বুলেট আর টিয়ারশেল নামিয়ে আনা হয়েছিল, তখন আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়েছিল তাঁদের আর্তনাদে। সেই শাপলা চত্বর আজ কেবল একটি জায়গা নয়, বরং এ দেশের এক বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রতি রাষ্ট্রের নিষ্ঠুর আচরণের এক জীবন্ত দলিল।
মাদ্রাসা ছাত্রদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, তাদের অন্ধকারাচ্ছন্ন প্রমাণের চেষ্টা করা হয়। অথচ তারা এই মাটিরই সন্তান। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্র যেখানে হওয়ার কথা ছিল নিরাপদ আশ্রয়, সেখানে আজ সাধারণ মানুষ এবং আলেম সমাজ কেবল অবহেলার শিকার। আমরা এমন এক রাষ্ট্র গড়ে তুলেছি যেখানে সত্য কথা বলা মানেই বিপদে পড়া, আর হকের পথে চলা মানেই নির্যাতনের শিকার হওয়া। এই চরম বৈষম্য আর দীর্ঘদিনের জমানো ক্ষোভের এক পাহাড় সমান হাহাকার ফুটে উঠেছে এ সময়ের এক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরের কণ্ঠে।
হাফেজ মুসান্নিফ আব্দুল্লাহ মুসাব্বির বলেন, আমি রাষ্ট্রের কেউ না; আমি শুধু ভ্যাট দিবো, ট্যাক্স দিবো, গুলি খাবো, মরে যাবো কারণ আমি একজন মাদ্রাসা পড়ুয়া, ইমাম বা শিক্ষক।
এই কথাটি কোনো সাধারণ আবেগ নয়, বরং এটি একজন নাগরিকের রাষ্ট্রের প্রতি চূড়ান্ত অভিমান। যখন একজন মানুষ তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো পবিত্র কোরআনের পেছনে ব্যয় করে, যখন সে সমাজের মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকার দায়িত্ব নেয়, আর যখন সে আগামীর প্রজন্মকে নৈতিকতা শেখায়—তখন তার পাওয়ার কথা ছিল রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মান।
অথচ আজ তাকেই স্বীকার করে নিতে হচ্ছে যে, রাষ্ট্রের কাছে তার পরিচয় কেবলই রক্ত দেওয়ার জন্য। তিনি ভ্যাট দিচ্ছেন, ট্যাক্স দিচ্ছেন, রাষ্ট্রের চাকা সচল রাখছেন; কিন্তু বিনিময়ে যখন অধিকারের কথা বলছেন, তখন তাকে উপহার দেওয়া হচ্ছে লাঠিচার্জ আর বুলেট। এই যে নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা, এটিই প্রমাণ করে যে আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা আজ কতটা সংকটাপন্ন।

