ইসরায়েলকে নিয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগানের সাম্প্রতিক হুমকি কেবল রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর ভূ-রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা। এরদোগান যখন বলেন, “পাকিস্তান মধ্যস্থতা না করলে ইসরায়েলকে উপযুক্ত শিক্ষা দেওয়া হতো,” তখন তিনি মূলত মুসলিম বিশ্বের একক নেতা হিসেবে নিজের অবস্থানকে জাহির করতে চান। তবে আবেগ সরিয়ে বাস্তবতার নিরিখে বিচার করলে দেখা যায়, তুরস্কের জন্য ইসরায়েলে সরাসরি সামরিক অভিযান পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্য হওয়ায় তুরস্কের যেকোনো আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ ওয়াশিংটনের সাথে সরাসরি সংঘাত ডেকে আনবে। এছাড়া ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা এবং পর্যাপ্ত উভচর রণতরীর অভাব তুরস্কের জন্য এক বড় অন্তরায়।
মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ইয়োনি বিন মেনাচেমের মতে, তুরস্কের এই রণকৌশলের আসল উদ্দেশ্য হলো পরবর্তী ‘ইরান’ হওয়া। অর্থাৎ, ইরান যেভাবে ‘শিয়া প্রতিরোধ অক্ষ’ গড়ে তুলেছে, তুরস্কও ঠিক একইভাবে পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং মিসরকে নিয়ে একটি শক্তিশালী ‘সুন্নি অক্ষ’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই দেশগুলোর মধ্যে সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং সৌদি আরবে পাকিস্তানের সেনা মোতায়েন সেই লক্ষ্যেই ইঙ্গিত দেয়। এরদোগান হয়তো মনে করছেন, চলমান সংঘাতে ইরান যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে যে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হবে, তা পূরণের যোগ্য দাবিদার কেবল তুরস্কই।
তবে ইতিহাস ও বর্তমান শক্তি সামর্থ্যের বিচার করলে এই পরিকল্পনা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। ১৯৪৮, ১৯৬৭ এবং ১৯৭৩ সালের যুদ্ধে আরব দেশগুলোর শোচনীয় পরাজয় প্রমাণ করেছে যে কেবল আবেগ দিয়ে যুদ্ধ জেতা যায় না। ১৯৭৩ সালের পর ইসরায়েল এখন মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ এবং প্রযুক্তিগতভাবে তারা অনেক দূর এগিয়ে গেছে। তুরস্কের নেতৃত্বে নতুন কোনো অক্ষ গঠিত হলেও, তা ইসরায়েলের অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সামনে কতটা টিকবে, সেটি নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। ইসরায়েলের মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রকে মোকাবিলা করতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী সামরিক সক্ষমতা এবং মুসলিম বিশ্বের প্রকৃত ঐক্য। যতদিন বিভেদ ভুলে মুসলিম সমাজ একই লক্ষ্যে অবিচল হতে না পারবে, ততদিন এই হুমকিগুলো কেবল কূটনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
—তাওসিফ_আবদুল্লাহ

