নাজমুল হোসেন, (ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি:
ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রীর তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। চিকিৎসা নিতে এসে অধিকাংশ রোগীই ওষুধ না পেয়ে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন গ্রামের নারীরা।
উপজেলার গোগোর গ্রামের গৃহবধূ মালেকা খাতুন (২৯) ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অসুস্থ হয়ে ক্লিনিকে গেলে চিকিৎসক পাওয়া যায় না, ওষুধও থাকে না। “শুধু ওরস্যালাইন আর আয়রনের ট্যাবলেট দেয়। গর্ভনিরোধের ‘সুখী’ ট্যাবলেটসহ কিছুই পাওয়া যায় না। এমন ক্লিনিক থেকে গ্রামের মানুষের কী উপকার?”—প্রশ্ন তার।
তিনি জানান, প্রায় এক বছর ধরে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে নিয়মিত ওষুধ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। ফলে রোগীরা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।
আমজুয়ান গ্রামের রকেয়া খাতুন বলেন, গ্রামের অনেক নারী এখনো পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে সচেতন নন। তারা গর্ভনিরোধের জন্য ক্লিনিকে গিয়ে ‘সুখী’ ট্যাবলেট, কনডম বা ইনজেকশন নিতে চান, কিন্তু কিছুই পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে বাইরে ফার্মেসি থেকে কিনতে হয়। অনেক অশিক্ষিত পরিবার জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি মানছেন না, এতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আগে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে ২২ ধরনের ওষুধ সরবরাহ করা হলেও বর্তমানে শুধু ওরস্যালাইনই পাওয়া যাচ্ছে। কোচল কমিউনিটি ক্লিনিকের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার আপতারুল ইসলাম জানান, ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বরের পর থেকে ক্লিনিকে কোনো ওষুধ সরবরাহ করা হয়নি। প্রতিদিন রোগীরা এসে ওষুধ না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, ক্লিনিকের কর্মচারীরাও দীর্ঘদিন ধরে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। গ্রেড ১৪ থেকে ১৬-এ নামিয়ে দেওয়ায় কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডাররা আন্দোলনের কথাও ভাবছেন।
উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আল-হানিফ বলেন, প্রায় এক বছর ধরে কেন্দ্র থেকে ওষুধ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে, সরবরাহ পেলে দ্রুত ক্লিনিকগুলোতে বিতরণ করা হবে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কালাম আহমেদ জানান, উপজেলায় মোট ২৭টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে এবং সবগুলোর অবস্থাই একই। বিষয়টি সমাধানে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে।
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের সিভিল সার্জন ডা. আনিছুর রহমান বলেন, জেলায় ১৪৯টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে পরিচালিত হলেও বর্তমানে ট্রাস্টের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। ট্রাস্টে যাওয়ার পর থেকেই নানা জটিলতা দেখা দিয়েছে। কয়েক মাস ধরে কর্মচারীরা বেতন পাচ্ছেন না, পাশাপাশি ওষুধ সরবরাহও বন্ধ রয়েছে।
ওষুধ সংকট ও জনবল ঘাটতির কারণে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। দ্রুত সমস্যার সমাধান না হলে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা আরও ভেঙে পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

