ডোনাল্ড ট্রাম্পের ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে ইরানের পারমাণবিক উপাদান বা ‘পারমাণবিক ধুলো’ হস্তান্তরের দাবি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যা তেহরান তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে একে “উটের স্বপ্ন” বলে অভিহিত করেছে।
ট্রাম্প প্রশাসন যখন একটি ঐতিহাসিক চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছানোর দাবি করছে, তখন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার এবং অন্যান্য সরকারি সূত্রগুলো স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ওয়াশিংটনের সাথে পারমাণবিক উপাদান হস্তান্তরের বিষয়ে কোনো আলোচনা তো দূরের কথা, বড় কোনো অগ্রগতিই হয়নি।
নিউইয়র্ক টাইমস ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্যমতে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিতের সময়সীমা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে এখনো বিশাল ব্যবধান বিদ্যমান। ট্রাম্প যেখানে ২০ বছরের স্থগিতাদেশ চাইছেন, তেহরান সেখানে মাত্র পাঁচ বছরে সীমাবদ্ধ থাকতে অনড়। এই বৈপরীত্য প্রমাণ করে যে, ট্রাম্পের দাবিগুলো যতটা না বাস্তবসম্মত, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক প্রচারণামূলক।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ সময় শুক্রবার ভোররাত থেকে লেবাননে কার্যকর হওয়া ১০ দিনের যুদ্ধবিরতিকে ট্রাম্প নিজের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দাবি করলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন কথা বলছে। আল জাজিরা ও আল মায়াদিন টেলিভিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই যুদ্ধবিরতি মূলত ইরানের নিবিড় কূটনৈতিক প্রচেষ্টারই ফসল, যা হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকেও স্বীকার করা হয়েছে।
তবে যুদ্ধবিরতি শুরু হতে না হতেই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারে অস্বীকৃতি এবং সেখানে “নিরাপত্তা বলয়” বজায় রাখার ঘোষণা পুরো চুক্তিটিকে খাদের কিনারে নিয়ে দাঁড়িয়ে করিয়েছে। এমনকি যুদ্ধবিরতির প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি গোলাবর্ষণ ও ধ্বংসযজ্ঞের খবর পাওয়া গেছে, যা লেবাননের সেনাবাহিনী কর্তৃক চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে। এই ভঙ্গুর পরিস্থিতি এটাই ইঙ্গিত দেয় যে, হিজবুল্লাহর সতর্ক অবস্থান এবং ইসরায়েলের আগ্রাসী মনোভাবের কারণে এই শান্তিপ্রচেষ্টা যেকোনো সময় ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে।
সামগ্রিক ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে দেখা যাচ্ছে, উভয় পক্ষই যখন আলোচনার টেবিলে বসেছে, ঠিক তখনই তারা যুদ্ধের জন্য নিজেদের “ওয়েপন রিলোড” বা অস্ত্রশস্ত্রের মজুদ বাড়িয়ে চলেছে। আমেরিকার বিমানবাহী রণতরী জর্জ এইচ ডাব্লিউ বুশ এবং অতিরিক্ত ১০ হাজার সেনার উপস্থিতি যেমন পেন্টাগনের যুদ্ধপ্রস্তুতির জানান দিচ্ছে, তেমনি ইরানও তাদের “মিসাইল সিটি” ও ড্রোন উৎপাদন ১০ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়ে পাল্টা জবাবের জন্য তৈরি থাকছে।
ডেনিয়েল ডেভিস ও ল্যারি জনসনের মতো বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের মনমতো চুক্তি না হলে আমেরিকা আবারও সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে পারে। তবে এই সংকটের সমাধান এখন সম্পূর্ণভাবে ট্রাম্পের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। ইরান ও লেবানন ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হওয়ার পর এখন পাল্টা ছাড় দেওয়ার পালা আমেরিকার। সাম্রাজ্যবাদী অহমিকা ত্যাগ করে ট্রাম্প যদি বাস্তবসম্মত শান্তির পথ বেছে না নেন, তবে এই সাময়িক যুদ্ধবিরতি কেবল একটি বৃহত্তর ও ভয়াবহ যুদ্ধের প্রস্তুতিমূলক বিরতি হিসেবেই ইতিহাসে চিহ্নিত হবে।

