সত্যজিৎ দাস (মৌলভীবাজার):
মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণভাগ ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উপ-সহকারী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত তহসিলদার) আশীষ কুমার সরকারের বিরুদ্ধে খাজনা আদায়ে হয়রানি, সরকারি রসিদ জালিয়াতি, উৎকোচ গ্রহণ, নামজারিতে অনিয়ম এবং অবৈধ মাটি কাটায় জড়িতদের সহযোগিতার অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগে অতিষ্ঠ হয়ে অর্ধশতাধিক ভুক্তভোগী জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
অভিযোগের অনুলিপি ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্থানীয় সংসদ সদস্য, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হবিগঞ্জ কার্যালয়ের উপ-পরিচালক, বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ডের কাছেও পাঠানো হয়েছে।
লিখিত অভিযোগে ভুক্তভোগীরা উল্লেখ করেন, দক্ষিণভাগ ইউনিয়ন ভূমি অফিসের পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই আশীষ কুমার সরকার খাজনা আদায়ে ভূমি মালিকদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করছেন। তাদের দাবি, পূর্ববর্তী বছরের খাজনা পরিশোধের সরকারি রসিদ থাকা সত্ত্বেও তিনি সেসব রসিদকে ভুয়া বা জাল বলে প্রত্যাখ্যান করেন। অনেক ক্ষেত্রে ১৪১৪,১৪২০,১৪২৫ কিংবা ১৪২৯ বঙ্গাব্দের রসিদ থাকলেও ১৩৭৯ সাল থেকে বকেয়া দেখিয়ে অনলাইনে বিপুল অঙ্কের অর্থ এন্ট্রি করা হয়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ,পরে বকেয়া কমিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তাদের কাছ থেকে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হলেও সরকারি রসিদ দেওয়া হয় মাত্র ১১২ টাকার। তারা বলেন,সংশ্লিষ্ট ইউজার আইডি ও নোটিশ যাচাই করলে এসব অনিয়মের সত্যতা পাওয়া যাবে।
অভিযোগে আরও বলা হয়,খাজনা আদায়ের নামে মাইকিং করে ভূমি মালিকদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করা হয়। নোটিশে উল্লেখিত অর্থের অর্ধেক পরিশোধ করলে কাজ সহজ করে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। অনেকেই অর্থ দেওয়ার পরও ১১২ থেকে ১৫০০ টাকার সরকারি রসিদ পান। এ বিষয়ে প্রশ্ন তুললে তহসিলদার বিভিন্ন জায়গায় টাকা দিতে হয় বলে দাবি করেন এবং বেশি কথা বললে রসিদ বাতিল কিংবা সার্টিফিকেট মামলা দিয়ে জমি খাস খতিয়ানে নেওয়ার হুমকি দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নামজারি প্রক্রিয়াতেও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের ভাষ্য,অনলাইনে আবেদন জমা দেওয়ার পর প্রতিবেদনের সময় আবেদনকারীদের অফিসে ডেকে জমির সীমানা,তফসিল বা নথিপত্রে ভুল দেখিয়ে আবেদন বাতিলের ভয় দেখানো হয়। পরে বিষয়টি ‘ম্যানেজ’ করার ইঙ্গিত দিয়ে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়। টাকা দিলে অনুকূল প্রতিবেদন দেওয়া হলেও অন্যথায় নানা আইনগত কারণ দেখিয়ে আবেদন বাতিলের সুপারিশ পাঠানো হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া অবৈধ মাটি কাটা ও পরিবেশ ধ্বংসের ঘটনায়ও তহসিলদারের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি,২০২৪ সালে ওই অফিসে যোগদানের পর অসাধু চক্রের সঙ্গে যোগসাজশে বিভিন্ন টিলা ও ফসলি জমির মাটি পাচার হয়েছে। মাটি ব্যবসায়ী ও ইটভাটা মালিকদের কাছ থেকে মাসোহারা নেওয়ার কারণে এসব কার্যক্রম বন্ধে তিনি কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অবৈধ মাটি কাটার বিষয়ে এসিল্যান্ডের কাছে অভিযোগ করা হলে তদন্তের দায়িত্বও অভিযুক্ত কর্মকর্তাকেই দেওয়া হয়। তিনি তদন্তে কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাননি বলে প্রতিবেদন দেন। এমনকি মোবাইল কোর্ট অভিযানের আগেই সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের তথ্য জানিয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ফলে অভিযানস্থলে পৌঁছানোর আগেই ট্রাক,ট্রাক্টর ও শ্রমিক সরিয়ে নেওয়া হয়।
ভূমি মালিক মতিলাল দাস,মো. কুরেশীয়া ও রহিম বক্ত মুসাসহ একাধিক ব্যক্তি বলেন,নিয়ম মেনে খাজনা দিতে গেলেও তারা হয়রানির শিকার হন। অতিরিক্ত বকেয়া দেখিয়ে চাপ সৃষ্টি করা হয় এবং পরে অর্থের বিনিময়ে সমাধানের প্রস্তাব দেওয়া হয়। এতে রাজি না হলে খাজনা ও ভূমি-সংক্রান্ত অন্যান্য কাজে জটিলতা তৈরি করা হয়।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আশীষ কুমার সরকার সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন,‘অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। কোনো প্রমাণ থাকলে সংবাদ প্রকাশ করতে পারেন।’
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন,ঈদের ছুটি শেষে অফিস খোলার পর অভিযোগটি তদন্তে পাঠানো হবে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

