আবু জাফর বিশ্বাস, বরিশাল:
কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে খাল খনন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালিয়েও বরিশাল সিটি করপোরেশন (বিসিসি) এলাকায় জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ কমেনি। বরং সামান্য থেকে মাঝারি বৃষ্টিতেই নগরের প্রধান সড়ক, অলিগলি ও নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গিয়ে নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। এতে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—কোটি টাকার প্রকল্পের সুফল কোথায়?
সম্প্রতি টানা দুই দিনের ভারী বৃষ্টিতে বরিশাল নগরের অধিকাংশ এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। নগরীর বগুড়া রোড, আমানতগঞ্জ, সদর রোড, মুন্সী গ্যারেজ, নবগ্রাম রোড, রসুলপুর, পলাশপুর ও মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়ক ডুবে গিয়ে যান চলাচল ব্যাহত হয়। বিশেষ করে নবগ্রাম রোডের হাতেম আলী কলেজ ছাত্রাবাস থেকে চৌমাথা পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার সড়ক দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েন স্থানীয়রা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বরিশাল নগরের আমানতগঞ্জ, জেল খাল, রূপাতলী, পলাশপুর, সাগরদী, চাঁদমারী ও ভাটার খাল—এই সাতটি খাল খনন করে। এতে ব্যয় হয় প্রায় ৭ কোটি টাকা। কিন্তু দুই বছর না পেরোতেই খালগুলো আবারও ভরাট হয়ে পড়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের বদলে আগের মতোই সড়ক ও বসতিতে জমে থাকছে।
নগরবাসীর অভিযোগ, শুধু খাল খনন করেই দায়িত্ব শেষ করা হয়েছে; খালের সঙ্গে সংযুক্ত ড্রেন, নালা ও উপশাখা ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন না হওয়ায় পুরো প্রকল্প কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বরিশাল সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, গত বছর প্রশাসকের উদ্যোগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাল পরিষ্কার করা হলেও নগরের অলিগলির নালাগুলো অপরিষ্কার ও অকার্যকর থাকায় বর্ষার শুরুতেই জলাবদ্ধতা প্রকট আকার নিয়েছে।
বৃষ্টির পানিতে সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় চরম ক্ষতির মুখে পড়ছেন চালক ও পথচারীরা। নবগ্রাম রোডের বাসিন্দা আবদুর রাজ্জাক বলেন, বৃষ্টি হলেই বটতলা থেকে চৌমাথা পর্যন্ত পুরো রাস্তা পানির নিচে চলে যায়। চলাচলই দায় হয়ে পড়ে।
অটোরিকশাচালক আবদুর রহমান জানান, রাস্তায় পানি জমে থাকলে ব্যাটারি ও মোটরে পানি ঢুকে গাড়ি বিকল হয়ে যায়, তখন সারাদিনের আয় বন্ধ।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের হিসাব শাখা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পরিচ্ছন্নতা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ৬০ লাখ টাকা। এর বাইরে জরুরি নগর পরিচ্ছন্নতায় ১৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই বরাদ্দ জলাবদ্ধতা রোধে প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল।
বিসিসির পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা ইউসুফ আলী বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে নিয়মিত ড্রেন, নালা ও খাল পরিষ্কারের জন্য বাজেটে কিছু বরাদ্দ থাকে, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। অন্যদিকে পাউবোর ৭ কোটি টাকার খাল উন্নয়ন কাজ কতটা কার্যকর হয়েছে, সে বিষয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।
এ বিষয়ে বিসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল বারী জানান, খণ্ড খণ্ড উদ্যোগে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। নগরের ২৯টি খাল পুনঃখনন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে ৭৫৯ কোটি টাকার একটি বৃহৎ প্রকল্প একনেকের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তবে নাগরিক সমাজ বলছে, শুধু নতুন প্রকল্প নিলেই হবে না; প্রয়োজন বাস্তবসম্মত মাস্টারপ্ল্যান, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং সমন্বিত ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা। বরিশাল সাধারণ নাগরিক সমাজের আহ্বায়ক কাজী মিজানুর রহমান বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণেই সামান্য বৃষ্টিতেই নগরবাসীকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। স্থায়ী সমাধানে সমন্বিত পরিকল্পনা জরুরি।
বরিশালবাসীর প্রশ্ন এখন একটাই—প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা খরচ হলেও কেন বৃষ্টির পানি নামছে না? উত্তর খুঁজছে পুরো নগরী।

