আব্দুস সালাম মোল্লা, স্টাফ রিপোর্টার :
ফরিদপুরের মধুখালী ও আলফাডাঙ্গায় মধুমতী নদীর স্থায়ী বাঁধ নির্মাণে ফিরেছে স্বস্তি। ৪৮৭ কোটি টাকার এই প্রকল্পে নদীভাঙন থেকে রক্ষা পাচ্ছে হাজারও পরিবার ও বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ স্মৃতি জাদুঘর। ইতোমধ্যে প্রকল্পের ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।
এখন আর ভাঙনের আতঙ্ক নেই। বরং নদীপাড়ের বেঞ্চ ও ছাতা এলাকাটিকে দৃষ্টিনন্দন বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত করেছে। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর এবার নিশ্চিন্তে ঈদ কাটাবে বলে আশা স্থানীয়দের। ঈদের আগেই বাঁধের কাজ প্রায় শেষ হওয়ায় নদীপাড়বাসীর মধ্যে বইছে আনন্দ ও উচ্ছ্বাস।
গত কয়েক যুগ ধরে মধুমতীর ভয়াবহ ভাঙনে একের পর এক গ্রাম, ফসলি জমি ও মানুষের বসতভিটা নদীতে বিলীন হয়েছে। অসংখ্য পরিবার হারিয়েছে তাদের সাজানো সংসার। অবশেষে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের ফলে সেই দুর্ভোগ থেকে রক্ষা পাচ্ছে মধুখালী ও আলফাডাঙ্গার বিস্তীর্ণ এলাকা।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৪৮৭ কোটি টাকা ব্যয়ে মধুখালী ও আলফাডাঙ্গা উপজেলার ৮টি পয়েন্টে প্রায় সাড়ে ৯ কিলোমিটার স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। ২০২৩ সালের ১ জুলাই শুরু হওয়া এ প্রকল্পের কাজ ২০২৭ সালের ৩০ জুন শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ইতোমধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় মধুমতী ছিল আতঙ্কের নাম। বর্ষা এলেই শুরু হতো ভাঙনের ভয়। কিন্তু বর্তমানে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের ফলে মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে। পাশাপাশি ভাঙন ঝুঁকিতে থাকা বীরশ্রেষ্ঠ শহিদ ল্যান্স নায়েক মুন্সী আব্দুর রউফ গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরও এখন নিরাপদ রয়েছে।
কামারখালী এলাকার নদীপাড়ের বাসিন্দা রোকেয়া বেগম বলেন, ‘প্রতিবছর বর্ষা আর ঈদের সময় আতঙ্কে থাকতে হতো। ভাঙনের কারণে কখন ঘর নদীতে চলে যায় সেই ভয় ছিল। এখন বাঁধ হওয়ায় অনেক শান্তিতে আছি।’
স্থানীয় কৃষক কাদের মোল্লা বলেন, ‘আমাদের অনেক জমি নদীতে হারিয়ে গেছে। এবার বাঁধ হওয়ায় অন্তত বাকি জমি রক্ষা পাবে। আমরা সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ।’
এ ব্যাপারে কামারখালী ইউপি চেয়ারম্যান ইরান চৌধুরী জানান, নদীর তীর সংরক্ষণমূলক কাজ বাস্তবায়নের মাধ্যমে নদী ভাঙন রোধ ও বন্যার হাত থেকে স্থানীয়রা রক্ষা পাবে। এ ছাড়া ড্রেজিং দ্বারা নদীর প্রবাহ ও নাব্য স্বাভাবিক রাখা হবে বলে আশা করছি।
এ বিষয়ে ফরিদপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক আবজাল হোসেন খান পলাশ বলেন, জেলার মধুখালী ও আলফাডাঙ্গা উপজেলার অন্তর্গত ৮টি প্রবল নদী ভাঙনকবলিত স্থানে বিদ্যমান সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা, শহিদ বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ স্মৃতি জাদুঘর, সংযোগ সড়ক, ফরিদপুর জেলার সর্ববৃহৎ স্বপ্ননগর আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরবাড়ি, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাট-বাজার, কমিউনিটি ক্লিনিক, ধর্মীয় উপসনালয়, ফসলি জমি ও বাসযোগ্য জমি, বসবাসের বাড়িঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনা ইত্যাদি নদীভাঙন থেকে রক্ষা করা।
ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব হোসেন বলেন, ‘মধুমতীর ভাঙন রোধে এটি একটি বড় প্রকল্প। বাঁধ নির্মাণের ফলে হাজারও পরিবার, ফসলি জমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা পাবে। পাশাপাশি এলাকাটিকে দৃষ্টিনন্দন করতেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাঁধকে আকর্ষণীয় করতে নদীপাড়ে বসানো হয়েছে স্থায়ী বেঞ্চ ও ছাতা। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ সেখানে ঘুরতে আসছেন। এটি এখন শুধু বাঁধ নয়, ধীরে ধীরে একটি বিনোদন কেন্দ্রেও পরিণত হচ্ছে। আসন্ন বর্ষা মৌসুমে এখন আর ভাঙনের ভয় নেই, আছে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন।’

