বাঙালির রান্নাঘরে ডিমের মহিমা অপরিসীম। ডিম ভাজি, ডিম ভুনা কিংবা মেহমান আসলে ঝোল করে ডিমের ওপর একটু চাকু দিয়ে দাগ কেটে দেওয়া — আমাদের রসনাবিলাসের অন্যতম অনুষঙ্গ। কিন্তু মানুষ যে কেবল ডিমের কুসুম আর সাদা অংশ ভালোবাসে তা নয়, মাঝেমধ্যে এই ডিমকে রাজনীতির ময়দানেও ‘নিক্ষেপণ অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করতে বেশ পছন্দ করে। এই পছন্দটা কেবল বাঙালির একার নয়, আন্তর্জাতিক মহলেও এর ব্যাপক ‘সুনাম’ রয়েছে!
গতকাল ঝিনাইদেহে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক Nasiruddin Patwary’র ওপর ধেয়ে আসা গোটা কয়েক ডিমের ঘটনাই ধরা যাক। ঠিক যেন নিখুঁত টার্গেট প্র্যাকটিস! এই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে পরিমাণ আলোচনা আর রসাত্মক ট্রল হলো, তাতে মনে হতেই পারে — রাজনীতিতে ইদানীং নীতি-আদর্শের চেয়ে ‘ডিমের প্রোটিন’ বেশি ভূমিকা রাখতেছে।
তবে ঝিনাইদহের এই ঘটনাকে কিন্তু বৈষম্যবিরোধী রাজনীতি বা বর্তমান প্রেক্ষাপটে একেবারেই নতুন বা বিচ্ছিন্ন ভাবার সুযোগ নেই। ডিম থেরাপির এই আন্তর্জাতিক সংস্কৃতিতে তাকালে বেশ মজার কিছু মিল খুঁজে পাওয়া যায়। আর্নল্ড সোয়ার্জনেগার বা রাজা চার্লসের মতো বৈশ্বিক হেভিওয়েটদের ডিম-কাণ্ডের যে আন্তর্জাতিক ঐতিহ্য, তার সাথে আমাদের ঝিনাইদহের এই টাটকা ঘটনার একটা তুলনামূলক ‘মসলা’ দিলে লেখাটা আরও জমজমাট হবে।
যেমন ধরেন, ২০১৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার বর্ণবাদী সিনেটর ফ্রেজার অ্যানিং যখন একটা বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন, তখন ১৭ বছরের এক কিশোর (যে পরে ‘এগ বয়’ নামে বিশ্বখ্যাত হয়) লাইভ ক্যামেরার সামনে তার মাথায় ডিম ভেঙে দিয়েছিল। ঝিনাইদেহেও যেমন নাসিরুদ্দিনের ওপর ডিম পড়ার পর ভিডিও ভাইরাল হতে সময় লাগেনি, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ঐ ডিম-কাণ্ডের ভিডিও নিমেষেই সুপারহিট হয়।
আবার যুক্তরাজ্যের রাজা চার্লস যখন ২০২২ সালে ইয়র্ক শহরে হাঁটছিলেন, তখন তাকে লক্ষ্য করেও ডিম ছোঁড়া হয়েছিল। এমনকি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ তো ২০১৭ এবং ২০২১ — দুই দুইবার ডিমের ‘আশীর্বাদ’ মাথায় ও কাঁধে নিয়েছেন। মার্কিন মুলুকেও এর কমতি নেই; ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর নির্বাচনের সময় হলিউড তারকা আর্নল্ড সোয়ার্জনেগারের গায়ে যখন ডিম এসে পড়, তিনি তখন রেগে না গিয়ে রসিকতা করে বলেছিলেন, “ডিমটা তো দিলেন, সাথে একটু মাংসের টুকরো দিলে নাস্তাটা জমে যেত!”
বিদেশের এই সব বাঘা বাঘা ঘটনার সাথে আমাদের দেশের ডিম-কাণ্ডের দুই-চারটা মিল দেখা যায়। তবে টাইমিং আর প্রতিক্রিয়া সবখানেই এক। বাংলাদেশে যখনই কোনো দল বা গোষ্ঠী প্রতিপক্ষের কোনো কথায় চরম বিরক্ত হয়, তখনই তারা বাজারের সবচেয়ে সস্তা বা পচা ডিমটা খুঁজে বের করে। যেন পকেটে ইঁট-পাটকেল রাখার চেয়ে একটা মাঝারি সাইজের লাল ডিম রাখা অনেক বেশি সুবিধাজনক ও কৌশলগতভাবে নিরাপদ!
ডিম খাওয়ার পর প্রতিপক্ষের যে প্রতিক্রিয়া হয়, তাও দেখার মতো। ডিম যার গায়ে লাগে, তিনি সাধারণত সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, “এটা আসলে ডিম নয়, এটা আমার জনপ্রিয়তায় ইর্ষান্বিত হয়ে প্রতিপক্ষের বোমাবাজি!” আর যারা ডিম মারে, তারা বুক ফুলিয়ে বলে, “জনগণ তাদের ক্ষোভের ‘অমলেট’ উপহার দিয়েছেন।” ঝিনাইদেহের ঘটনাতেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। এক পক্ষ একে দেখছে ‘গণ-আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ’ হিসেবে, আর অন্য পক্ষ একে দেখছে স্রেফ ‘ষড়যন্ত্র’ বা ‘অসৌজন্যমূলক হামলা’ হিসেবে। শীতকালে আমরা যেভাবে পিঠা উৎসবে মাতি, দেশ-বিদেশের রাজনীতিবিদেরা যেন মাঝেমধ্যেই এমন‘ডিম উৎসবে’ মেতে ওঠেন। এতে মজা পাওয়া যায়।
তবে এই রসের পেছনে আসল কথা হচ্ছে, এই ‘ডিম থেরাপি’ কি আসলেই স্বাস্থ্যকর? লন্ডন থেকে ক্যালিফোর্নিয়া, কিংবা ফ্রান্স থেকে আমাদের ঝিনাইদেহ — লেখাটা পড়ে এতক্ষণ হয়তো অনেকেই মুচকি হাসছেন। কিন্তু এবার একটু গম্ভীর হওয়া যাক। রসালো এই কলামের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক কদর্য বাস্তবতা। রাজনীতিতে ডিম ছুঁড়ে মারা, কালি লেপে দেওয়া বা জুতা প্রদর্শন করা — যে নামেই একে ডাকা হোক না কেন, এটি অত্যন্ত খারাপ এবং নিন্দনীয় একটি কাজ।
যেকোনো গণতান্ত্রিক ও সভ্য সমাজে মতাদর্শের ভিন্নতা থাকবেই। একজনের বক্তব্য বা রাজনীতি আপনার পছন্দ নাও হতে পারে। সেই অসন্তোষ প্রকাশের ভাষা হওয়া উচিত যুক্তি, বুদ্ধিমত্তা, ব্যালট কিংবা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ। কিন্তু তা না করে একজন মানুষের গায়ে ডিম ছুঁড়ে মারা শুধু সেই ব্যক্তির শরীর বা কাপড় নোংরা করা নয়, বরং আমাদের রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও সংস্কৃতিকে চূড়ান্তভাবে কলুষিত করা।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি এমন অসৌজন্যমূলক আচরণ কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ সমর্থন করতে পারে না। আজ আপনি যাকে ডিম মারছেন, কাল হয়তো ক্ষমতার বা পরিস্থিতির চাকা ঘুরলে আপনার দিকেও একই ডিম ধেয়ে আসবে। এই নোংরা সংস্কৃতির চর্চা যত বাড়বে, সমাজ থেকে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা তত দ্রুত বিলুপ্ত হবে।
ডিম খাওয়ার জিনিস, তা খাবার টেবিলেই শোভা পায়; রাজনীতির ময়দানে অন্যের গায়ে মাখার জন্য নয়। রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে যুক্তির টেবিলে মোকাবিলা করাই বুদ্ধিমান ও সভ্য মানুষের কাজ, প্রতিপক্ষের গায়ে ডিম ছুঁড়ে নিজের দেউলিয়াত্ব প্রকাশ করা নয়।
লেখক: শিমুল চৌধুরী

