বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথ হরমুজ প্রণালি এখন আক্ষরিক অর্থেই এক অভেদ্য রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
দীর্ঘদিনের উত্তেজনা ছাপিয়ে ইরান এখন এমন এক সামরিক ও প্রযুক্তিগত শক্তি প্রদর্শন করছে, যা খোদ পরাশক্তি আমেরিকাকেও চরম ভাবিয়ে তুলেছে। গত কয়েক দিনে প্রণালিটি দফায় দফায় বন্ধ করে দেওয়া এবং সেখানে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন এক সমীকরণ তৈরি করেছে।
সাম্প্রতিক গোয়েন্দা রিপোর্ট এবং স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, ইরান হরমুজ প্রণালিতে তাদের ‘স্মার্ট মাইন’ এবং ‘কামিকাজে ড্রোন’-এর এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর তৈরি করেছে। তবে সবচেয়ে বড় চমক ছিল তাদের দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি স্টিলথ সাবমেরিন এবং রাডার ফাঁকি দেওয়া ফাস্ট অ্যাটাক ক্রাফট।
বিশেষ করে তিনটি ক্ষেত্রে ইরানের অগ্রগতি সামরিক বিশেষজ্ঞদের চোখ কপালে তুলেছে। প্রথমত, ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস (IRGC) এমন কিছু ছোট কিন্তু বিধ্বংসী ‘স্টিলথ স্পিডবোট’ মোতায়েন করেছে যা আধুনিক কোনো রাডারে ধরা পড়ে না। দ্বিতীয়ত, তারা এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) চালিত ড্রোন ব্যবহার করছে যা কোনো মানুষের নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে শত্রুর জাহাজ শনাক্ত করে আঘাত করতে পারে। তৃতীয়ত, উপকূলীয় এলাকায় পাহাড়ের নিচে ইরান এক বিশাল গোপন সুড়ঙ্গ পথ বা আন্ডারওয়াটার টানেল নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে, যেখান থেকে হঠাৎ করে ক্ষেপণাস্ত্রবাহী জাহাজ সাগরে বেরিয়ে এসে আবার মুহূর্তেই অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে।
মার্কিন নৌবাহিনী (US Navy) এই অঞ্চলে তাদের উপস্থিতি বাড়ালেও ইরানের এই ‘অপ্রতিসম যুদ্ধকৌশল’ (Asymmetric Warfare) মোকাবিলা করতে হিমশিম খাচ্ছে। সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান সরাসরি বড় যুদ্ধে না গিয়ে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে এমন এক ‘অদৃশ্য অবরোধ’ তৈরি করেছে যা ভাঙতে গেলে আমেরিকার বিশাল নৌবহরের বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ হয় বলে ইরানের এই শক্ত অবস্থানে অপরিশোধিত তেলের দাম বিশ্ববাজারে আকাশচুম্বী হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ধস এড়াতে অনেক দেশ এখন তেহরানের সাথে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে পথ খোঁজার চেষ্টা করছে। সামরিক শক্তি আর প্রযুক্তির এই মেলবন্ধন হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্রকে এক নতুন সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

