সত্যজিৎ দাস, (মৌলভীবাজার):
পরিবেশ রক্ষার স্লোগানে প্রতিবছর দেশজুড়ে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করা হলেও মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে উল্টো চিত্র দেখা গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। উচ্ছেদ অভিযানের নামে রাজকান্দি বন রেঞ্জের আদমপুর বন বিটের কালিঞ্জি এলাকায় প্রায় ১ হাজার ২০০ ফলন্ত কমলা গাছ কেটে ফেলার অভিযোগ উঠেছে বন বিভাগের বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ,দীর্ঘ আট বছর ধরে তারা বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে নিয়মিত টাকা দিয়ে বাগানটি টিকিয়ে রেখেছিলেন। সম্প্রতি আর্থিক সংকটের কারণে কথিত মাসোহারা দিতে না পারায় প্রতিশোধমূলকভাবে তাদের বাগান ধ্বংস করা হয়েছে।
তবে বন বিভাগ বলছে,সংরক্ষিত বনাঞ্চলের জমিতে কোনো ধরনের জবরদখল বা অবৈধ চাষাবাদ বৈধ নয়। বনের জমি পুনরুদ্ধারের অংশ হিসেবেই এ অভিযান চালানো হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ,বাগানটি অবৈধ হলে শুরুতেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন? আট বছর ধরে গাছগুলো বড় হতে দিয়ে ফল ধরার সময় কেন উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলো,তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
বাগানের মালিক মোছা. সালমা বেগম জানান, প্রায় ১০ কিয়ার (কানি) জমিতে তারা আট বছর ধরে কমলা,পেঁপে ও লাউয়ের বাগান গড়ে তুলেছিলেন। বাগান তৈরিতে বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন। চলতি মৌসুমে ফল বিক্রি করে ঋণ পরিশোধের আশা ছিল তাদের।
তিনি বলেন,“আর মাত্র কয়েক মাস পর ফল বিক্রি করার কথা ছিল। কিন্তু বন বিভাগের অভিযানে সব শেষ হয়ে গেছে। আমাদের স্বপ্ন ভেঙে গেছে।”
সালমা বেগম ও তার স্বামী আলিম উল্লাহর দাবি, বাগান থেকে এ বছর প্রায় ২৫ থেকে ২৬ লাখ টাকার ফল বিক্রির সম্ভাবনা ছিল। তাদের অভিযোগ,বাগান কাটার পাশাপাশি পানি সেচের একমাত্র মেশিনটিও নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।
সালমার শাশুড়ি আলেকজান বিবি অভিযোগ করেন,“আমরা নিয়মিত বন কর্মকর্তাদের টাকা দিয়ে আসছিলাম। এবার বেশি টাকা দিতে না পারায় আমাদের ওপর এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ,বন বিভাগের কথিত লিজ বাণিজ্য ও মাসোহারা নেওয়ার বিষয়ে গণমাধ্যমে তথ্য দেওয়ার পর থেকেই ওই পরিবারকে টার্গেট করা হয়েছে। তাদের দাবি, বনের জমিতে অন্যত্র পান ও জুম চাষ হলেও সেখানে একই ধরনের অভিযান দেখা যায় না।
এ বিষয়ে রাজকান্দি রেঞ্জ কর্মকর্তা প্রীতম বড়ুয়া বলেন,“সংরক্ষিত বনের ভেতরে যেকোনো ধরনের জবরদখল সম্পূর্ণ বেআইনি। বনের জমি অবমুক্ত করতে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। এটি আট বছর বা দশ বছর আগের দখল হলেও অবৈধ।”
‘টাকা দিলে বাগান বৈধ আর না দিলে অবৈধ হয় কীভাবে’-স্থানীয়দের এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুর রহমান বলেন,“১৯২০ সালের দিকে ভিলেজার ব্যবস্থা চালুর সময় শুধু নিচু জমিতে ধান চাষের জন্য জমি ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। পাহাড় বা টিলার ওপর ফলের বাগান করার কোনো নিয়ম নেই। বনের জমিতে ফলের বাগান নয়, সেখানে বনায়ন করা হবে-এই নীতির ভিত্তিতেই জমি পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন,বন বিভাগের কোনো কর্মকর্তা অনিয়ম বা টাকা নেওয়ার সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে,পরিবেশ রক্ষার নামে ফলন্ত ও উৎপাদনশীল গাছ কেটে ফেলার ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহলে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন,অবৈধ দখল উচ্ছেদের প্রয়োজন থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে বেড়ে ওঠা ফলদ গাছ অপসারণের আগে বিকল্প ব্যবস্থা বা পুনর্বাসনের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত ছিল।

