সম্প্রতি বেইজিংয়ের ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপলে’ বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরটি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি ও ভূরাজনীতিতে এক সম্পূর্ণ নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, প্রিমিয়ার লি ছিয়াং এবং ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সঙ্গে তাঁর আলাদা বৈঠক, পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অভ্যর্থনা এবং গান স্যালুট প্রমাণ করে— বেইজিং ঢাকাকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে জাঁকজমকপূর্ণ এই সফরের পর বাংলাদেশের মানুষের মূল কৌতুহল এখন একটিই— দৃশ্যমান কী কী চুক্তি হলো এবং এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী?
১৫টি সমঝোতা স্মারক (MoU) ও দ্বিপক্ষীয় ইনস্ট্রুমেন্ট স্বাক্ষরিত হওয়া এই সফরের প্রাপ্তি, অপ্রাপ্তি এবং পর্দার আড়ালের ভূরাজনীতিকে মূলত কয়েকটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়।
১. সম্পর্কের নতুন সমীকরণ: ‘অভিন্ন ভবিষ্যৎ সম্প্রদায়’
কূটনৈতিক পরিভাষায় এই সফরের সবচেয়ে বড় ঘোষণা হলো দুই দেশের সম্পর্কের মান উন্নয়ন। সম্পর্ককে “ব্যাপক কৌশলগত সহযোগিতা অংশীদারিত্ব” থেকে আরও উঁচুতে নিয়ে “নতুন যুগে বাংলাদেশ-চীন অভিন্ন ভবিষ্যৎ সম্প্রদায়” (Community with Shared Future) গড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চীনের কূটনৈতিক ভাষায় এটি হলো সর্বোচ্চ পর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের স্বীকৃতি, যা চীন কেবল তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও কাছের অংশীদারদের দিয়ে থাকে। এর মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক এখন কাগজে-কলমে সম্পূর্ণ নতুন একটি কৌশলগত কাঠামোতে প্রবেশ করলো।
২. মংলা বন্দর ও ভারতের হাতছাড়া হওয়া জমি
অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকে সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্যটি এসেছে মংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে। বাংলাদেশ ইকোনমিক জোনস অথরিটি (BEZA) চীনের সিসিইসিসি (CCECC)-এর সঙ্গে মংলা বন্দরের পাশে ১১০ একর জমিতে “চীন-বাংলাদেশ মংলা পোর্ট ইকোনমিক জোন” গড়ার চুক্তি করেছে।
এখানেই লুকিয়ে আছে বড় ভূরাজনৈতিক বার্তা। ২০১৫ সালের এক চুক্তির আওতায় এই জমিটি প্রথমে ভারতকে (হিরানান্দানি গ্রুপ) অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার জন্য দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শুরু না করায় ২০২৫ সালের অক্টোবরে ভারতীয় প্রকল্পটি বাতিল করে বাংলাদেশ। আর সেই একই জমিতে এখন চীনের প্রবেশ ঘটছে, যা দিল্লির জন্য একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক ধাক্কা। এর পাশাপাশি চট্টগ্রামের আনোয়ারাতেও চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে।
৩. বেসরকারি বিনিয়োগ ও তিস্তা প্রকল্প
বেসরকারি খাতের বড় খবরের মধ্যে রয়েছে চীনের হান্ডা গ্রুপের কেরানীগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ২২ কোটি ডলার বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত, যা মূলত আমাদের তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে অবদান রাখবে।
তবে বহুল আলোচিত ‘তিস্তা প্রকল্প’ নিয়ে বড় কোনো অর্থায়ন চুক্তি এবারও হয়নি। যৌথ ঘোষণাপত্রে শুধু পানি ব্যবস্থাপনা ও নদী ড্রেজিংয়ে সহযোগিতা গভীর করার কথা বলা হয়েছে এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনার (TRCMRP) সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (Feasibility Study) ত্বরান্বিত করার আশ্বাস দিয়েছে চীন। ফলে তিস্তা নিয়ে আশু কোনো বড় বিনিয়োগের স্বপ্ন এখনই সত্যি হচ্ছে না।
৪. প্রতিরক্ষা ও মিডিয়া ক্ষেত্রে চীনের ‘সফট পাওয়ার’
এই সফরে বাংলাদেশ ও চীন প্রথমবারের মতো পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে “২+২ সংলাপ” কাঠামো গড়তে সম্মত হয়েছে। সাধারণত অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সামরিক ও কৌশলগত মিত্র ছাড়া এমন সংলাপ হয় না। ভবিষ্যতে যেকোনো বড় ধরনের ডিফেন্স ডিল এই কাঠামোর মাধ্যমেই সম্পন্ন হবে। যৌথ ঘোষণাপত্রেই সরাসরি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সামরিক সফর ও প্রশিক্ষণ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
সামরিক অগ্রগতির পাশাপাশি বহুল আলোচিত ২০–২৪টি J-10CE মাল্টিরোল ফাইটার জেট কেনার আলোচনা বেশ এগিয়েছে। প্রায় ২.২ বিলিয়ন ডলারের এই প্যাকেজ চুক্তিটি এই সফরে স্বাক্ষরিত না হলেও, কূটনৈতিক সূত্র বলছে ২০২৬ সালের আগস্ট নাগাদ এটি চূড়ান্ত হতে পারে। এই সফরেই চুক্তিটি সম্পন্ন হলে বেইজিংয়ের অবস্থান আরও জোরালো হতো, যা আপাতত কিছুটা দীর্ঘায়িত হলো।
সাংস্কৃতিক ও তথ্যগত ক্ষেত্রেও চীনের প্রভাব বাড়ছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মিডিয়া (বিটিভি, বাসস, বেতার) সরাসরি চীনের রাষ্ট্রীয় মিডিয়া গ্রুপের সঙ্গে কনটেন্ট শেয়ারিংয়ের চুক্তি করেছে, যা তথ্য বিনিময়ে চীনের ‘সফট পাওয়ার’কে আরও সংহত করবে। এর পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল চীনে রপ্তানির সুযোগ তৈরি করে একটি ভিন্নধর্মী সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।
৫. ত্রিদেশীয় করিডোর ও ওয়াশিংটনের ‘লাল চোখ’
শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন ইকোনমিক করিডোর গড়ার প্রস্তাব এসেছে। এই করিডোর সফল হলে বাংলাদেশের বন্দর থেকে সরাসরি চীনের ইউনান প্রদেশ পর্যন্ত স্থলপথে যোগাযোগ তৈরি হবে, যা চীনকে ভারত মহাসাগরে সরাসরি প্রবেশাধিকার দেবে। চীন স্পষ্ট করেই জানিয়েছে, এই সহযোগিতা কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয় এবং এটি তৃতীয় পক্ষের প্রভাবমুক্ত থাকা উচিত— যা সরাসরি ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের বার্তা। এছাড়া ব্রিকস (BRICS) জোটে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির আবেদনকে স্বাগত জানিয়েছে চীন।
তবে এই কৌশলগত নৈকট্য ঢাকার জন্য এক বিরাট মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ২০২৬ সালের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের ‘রিসিপোকাল ট্রেড এগ্রিমেন্ট’ (RTA) সম্পন্ন হয়েছে, যার কারণে আমেরিকান বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের ট্যারিফ ৩৭% থেকে কমে ১৯% হয়েছে। কিন্তু সেই চুক্তিতে স্পষ্ট ধারা রয়েছে যে, কোনো “নন-মার্কেট ইকোনমি” (যেমন চীন বা রাশিয়া) এর সঙ্গে নতুন কোনো বড় বাণিজ্য বা প্রতিরক্ষা চুক্তি করা যাবে না। চীন থেকে J-10CE যুদ্ধবিমান কেনা বা এই ধরনের কৌশলগত চুক্তি যদি ওয়াশিংটনকে ক্ষুব্ধ করে, তবে টেক্সটাইল খাতের ওপর আবার উচ্চ ট্যারিফ আরোপের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
উপসংহার: ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট ও ফিফটি-ফিফটি সফলতা
সব মিলিয়ে এই সফরকে এখনই শতভাগ সফল বা ব্যর্থ বলা যাবে না। আপাতদৃষ্টিতে সফরের সফলতা ‘ফিফটি-ফিফটি’ বা ৫০/৫০। একদিকে বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে সর্বোচ্চ কূটনৈতিক কাঠামোতে নিয়ে গেছে, মংলার জমি চীনের হাতে তুলে দিয়ে ভূরাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে এবং প্রতিরক্ষা সংলাপের ভিত্তি স্থাপন করেছে। অন্যদিকে, বড় ধরনের কোনো অর্থনৈতিক ফান্ডিং (যেমন পদ্মা-যমুনা দ্বিতীয় সেতু বা ঢাকা-আশুলিয়া এক্সপ্রেসওয়ের জন্য অনুরোধ করা ৪ বিলিয়ন ডলার) বা যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তি এখনো চূড়ান্ত সিলমোহর পায়নি।
ঢাকা এখন বেইজিং এবং ওয়াশিংটন-দিল্লির অক্ষের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক কঠিন ‘ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট’ বা ভারসাম্য রক্ষার খেলা খেলছে। বছরের বাকি সময়ে আলোচনার এই চ্যানেলগুলো ব্যবহার করে বাংলাদেশ কতটা সুফল ঘরে তুলতে পারে এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে পারে— সেটাই এখন দেখার বিষয়।

