আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
চারদিকে যখন বিকট শব্দে ভেঙে পড়ছে বহুতল ভবন, ধুলো আর অন্ধকারের বুক চিরে ঘনিয়ে আসছে মৃত্যু—ঠিক সেই শেষ মুহূর্তেও নিজের জীবনের কথা ভাবেননি মা আন্দ্রেয়া। দুই বছর বয়সী ছোট্ট কন্যাসন্তান আলানাকে নিজের বুকের ভেতর শক্ত করে আগলে রেখেছিলেন তিনি।
মায়ের সেই পরম আলিঙ্গনই অলৌকিকভাবে বাঁচিয়ে দিয়েছে একরত্তি শিশুটিকে। তবে আন্দ্রেয়া নিজে মৃত্যুর হাত থেকে ফিরতে পারেননি। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে মায়ের নিথর দেহ উদ্ধার করা হলেও, তাঁর বুকের ভেতর থেকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে ছোট্ট আলানাকে।
হৃদয়বিদারক এই ঘটনাটি ঘটেছে গত বুধবার (২৪ জুন ২০২৬) সন্ধ্যায় ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা স্মরণকালের ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পে। সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে স্ত্রীর এমন আত্মত্যাগের খবরটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে নিশ্চিত করেছেন আন্দ্রেয়ার স্বামী ও ভেনেজুয়েলার পেশাদার ফুটবলার হেক্টর বেলো। তিনি দেশটির দ্বিতীয় বিভাগের ফুটবল ক্লাব ‘মারিতিমো দে লা গুয়াইরা’র হয়ে খেলেন।
স্ত্রী হারানোর অসীম শোক সামলাতে না পেরে ইনস্টাগ্রামে একের পর এক আবেগঘন পোস্ট করেছেন হেক্টর বেলো। একটি পোস্টে স্ত্রীর উদ্দেশ্যে তিনি লিখেছেন:
“আমার ভালোবাসা, একদিন আমি আমাদের মেয়েকে সেই গল্প বলব—কীভাবে তুমি তাকে বাঁচিয়েছিলে। কীভাবে নিজের জীবন উৎসর্গ করে তাকে নতুন জীবন দিয়ে গেছ। কীভাবে তুমি ছিলে এক সাহসী নারী, যে নিজের শেষনিঃশ্বাস পর্যন্তও আমাদের সন্তানকে ছেড়ে দেয়নি।”
অন্য একটি পোস্টে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে এই ফুটবলার লেখেন, “আমি কীভাবে বড় হয়ে যাওয়া মেয়েকে বোঝাব যে তাকে বাঁচাতে গিয়ে তুমি নিজের জীবন হারিয়েছ, আর বাবা হয়ে আমি দূর থেকে সেখানে কিছুই করতে পারিনি? আমি তাকে কীভাবে এটা বোঝাব? ঈশ্বর, আমাকে এখন বেঁচে থাকার শক্তি দাও।”
হেক্টর বেলো গতকাল শুক্রবার রাতে জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের পর তিনি কারাকাসের একটি হাসপাতালে ছুটে যান, যেখানে তাঁর মেয়ে আলানা ও আলানার খালা চিকিৎসাধীন আছেন। আজ তাদের হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে না, আরও কিছুদিন চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে থাকতে হবে। তবে তারা এখন আশঙ্কামুক্ত।
ভেনেজুয়েলার স্থানীয় ফুটবল বিষয়ক সংবাদ সংস্থা ‘কুমানা দে কাম্পেওনেস’ এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্প্যানিশ ভাষার সংবাদমাধ্যম ‘ইউনিভিশন’ আন্দ্রেয়ার মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছে।
ভেনেজুয়েলায় গত এক শতাব্দীর বেশি সময়ের মধ্যে এটিই সবচেয়ে ভয়াবহ ও বিধ্বংসী ভূমিকম্প। গত বুধবার সন্ধ্যায় ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী জোড়া ভূকম্পনে রাজধানী কারাকাস ও লা গুয়াইরাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের হাজার হাজার ভবন তাসের ঘরের মতো ধসে পড়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৯২০ জনে দাঁড়িয়েছে এবং আহত হয়েছেন তিন হাজারেরও বেশি মানুষ। তবে স্থানীয় সূত্রের দাবি, এখনো প্রায় ৫০ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন এবং ধীরগতির উদ্ধার অভিযানের কারণে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকাদের স্বজনদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
এই প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পে ভেনেজুয়েলার ফুটবল অঙ্গনেও বড় ধাক্কা লেগেছে। ফুটবলার হেক্টর বেলোর স্ত্রীর মৃত্যুর পাশাপাশি এই দুর্যোগে প্রাণ হারিয়েছেন দেশটির উদীয়মান দুই তরুণ ফুটবলার।
রাজান সিজা: ভেনেজুয়েলার ঐতিহ্যবাহী ‘কারাকাস ফুটবল ক্লাব’ জানিয়েছে, তাদের অনূর্ধ্ব-১৮ দলের প্রতিভাবান খেলোয়াড় রাজান সিজা লা গুইরায় নিজ বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ধসে পড়া ভবনের নিচে চাপা পড়ে নিহত হয়েছেন।
ভিক্টর পালাসিওস: কারাকাসভিত্তিক ক্লাব ‘স্পোর্ট সান আগুস্তিন’ এবং ভেনেজুয়েলা ফুটবল ফেডারেশন (এফভিএফ) নিশ্চিত করেছে যে, তাদের একাডেমির সাবেক ও মারিতিমো দে লা গুয়াইরা ক্লাবের খেলোয়াড় ভিক্টর পালাসিওসও এই জোড়া ভূমিকম্পে প্রাণ হারিয়েছেন।
এছাড়াও, সাবেক মিস ভেনেজুয়েলা জিসেল রেয়েস জানিয়েছেন, লা গুইরায় তাঁর মায়ের বহুতল ভবনটি পুরোপুরি ধসে পড়েছে এবং ভূমিকম্পের তীব্র আতঙ্ক ও ধাক্কা সামলাতে না পেরে হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে (হার্ট অ্যাটাক) তাঁর মা মারা গেছেন। ভেনেজুয়েলা জুড়ে এখন কেবলই স্বজন হারানোর বোবা কান্না আর ধ্বংসস্তূপের স্তব্ধতা।

