মো. আব্দুল কুদ্দুস, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি:
স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা মজলুম জননেতা মওলানা মরহুম আব্দুল হামিদ খান ভাসানী’র কর্মময়জীবনের উপর সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। মওলানা ভাসানী স্মৃতি সংরক্ষণ কমিটি ও খোদা-ই-খেদমতগারের আয়োজন।
বৃহস্পতিবার পৌর এলাকার সয়াধানগড়া (উত্তরপাড়া) অবস্থিত হাজী শরাফত আলী খান ও মজিরণ নেসা বিবি পাঠশালায়- উক্ত আলোচনা সভা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন, সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়নওমানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা) শাহাদাত হুসেইন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে এবং আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট,কেন্দ্রীয় বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোঃ সাইদুর রহমান বাচ্চু, সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক, হাজী আব্দুস সাত্তার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান, হাজী মোঃ আব্দুস সাত্তার, হাজী শরাফত আলী খান ও মজিরণ নেসা বিবি পাঠশালা ( সয়াধানগড়া উত্তর পাড়া) অবস্থিত এর সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা রেজাউল করিম খোকন, মওলানা ভাসানী ভক্ত, কবি ও কবিতা পরিষদ-সিরাজগঞ্জ সাবেক অর্থ সম্পাদক চিকিৎসক তছির উদ্দিন সেখ প্রমুখ।
এ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন, ন্যাপ ভাসানী পাটির ও মওলানা ভাসানী স্মৃতি সংরক্ষণ কমিটির চেয়ারম্যান ও মওলানা ভাসানী স্মৃতি সংরক্ষণ কমিটি ও খোদা-ই-খেদমতগার সভাপতি হাসরত খান ভাসানী।
আলোচক হিসেবে আরও বক্তব্যে রাখেন, মওলানা ভাসানী পরিষদের সদস্য সচিব লতিফুর রহমান খান (লিটন) প্রমুখ।
উক্ত আলোচনা সভা অনুষ্ঠানে- মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর জন্মভিটা সয়াধানগড়ায় একটি ৫ তলা বিশিষ্ট ‘ভাসানী কমপ্লেক্স’ নির্মাণের পরিকল্পনা করবেন বলে আশা করছি। তাতেপরিকল্পনা অনুযায়ী—প্রথম তলায়: থাকবে ক্যাফেটেরিয়া ও নামাজঘর; দ্বিতীয় তলায়: প্রতিষ্ঠা করা হবে হাজী শরাফত আলী খান ও মজিরণ নেছা বিবি পাঠশালা; তৃতীয় তলায়: থাকবে একটি আধুনিক অডিটরিয়াম; চতুর্থ তলায়: গড়ে তোলা হবে মওলানা ভাসানী জাদুঘর (মিউজিয়াম) ও পাঠাগার এবং পঞ্চম তলায়: থাকবে অতিথিশালা। (পরিবর্তনযোগ্য)এছাড়া, কৃষক-শ্রমিকের নয়নমণি মওলানা ভাসানীর নামে সিরাজগঞ্জে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জোর দাবি ও জানানো হয়।
জানা যায় যে, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীঃ- (১৮৮০-১৯৭৬) ছিলেন ব্রিটিশ ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের রাজনীতির এক কিংবদন্তি পুরুষ। আজীবন শোষিত, বঞ্চিত ও মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করায় তিনি ‘মজলুম জননেতা’ হিসেবে সমধিক পরিচিত।
মওলানা ভাসানীর বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের প্রধান দিকগুলো নিচে আলোচনা করা হলোঃ-
জন্ম ও প্রাথমিক জীবন : ১২’ডিসেম্বর ১৮৮০ খ্রি. সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার সয়াধানগড়া (উত্তর) গ্রামে মওলানা ভাসানী জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে পিতা-মাতাকে হারিয়ে অত্যন্ত কষ্টের মাঝে বেড়ে ওঠেন। তিনি আসামের ভাষানচর নামক স্থানে মাদ্রাসা স্থাপন করেন ও শিক্ষকতা শুরু করেন। সেই থেকে তার নামের সঙ্গে ‘ভাসানী’ যুক্ত হয়। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন ও আসামের লাইন প্রথা- তরুণ বয়স থেকেই তিনি সাম্রাজ্যবাদ ও জমিদারতন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন।
আসামে বাঙালিদের ওপর নিপীড়নমূলক ‘লাইন প্রথা’ এবং উচ্ছেদের বিরুদ্ধে তিনি তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন। কৃষকদের স্বার্থরক্ষায় তার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব তাকে সাধারণ মানুষের অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত করে। পাকিস্তান আমল ও আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনঃ- ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তিনি পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে আসেন। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন তৎকালীন সরকারের শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে তিনি গঠন করেন ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ (যা পরবর্তীতে অসাম্প্রদায়িক ‘আওয়ামী লীগ’-এ রূপান্তরিত হয়) এবং এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হন -কাগমারী সম্মেলন ও ঐতিহাসিক ‘আসসালামু আলাইকুম’
১৯৫৭ ইংসালে টাঙ্গাইলের কাগমারীতে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনে মওলানা ভাসানী পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন।
পশ্চিম পাকিস্তানের অবহেলার প্রতিবাদে তিনি সেখানে পূর্ব পাকিস্তানের অধিকারের কথা তুলে ধরেন। কেন্দ্রীয় সরকারের বৈষম্যের প্রতিবাদে তিনি প্রথমবারের মতো ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে পাকিস্তানকে বিদায় জানানোর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠনঃ- সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির আদর্শে বিশ্বাসী হয়ে ১৯৫৭ ইং সালে তিনি আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করেন। পরবর্তীতে ১৯৫৭ ইং সালে ‘ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি’ বা ‘ন্যাপ’ গঠন করে সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদ বিরোধী আন্দোলন অব্যাহত রাখেন।
স্বাধিকার আন্দোলন ও ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধঃ-
১৯৬৯ ইং সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে তার ভূমিকা ছিল অপরিসীম। তার আন্দোলনের ফলেই আইয়ুব খানের পতন ঘটে এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যান্যরা মুক্তি পান। ১৯৭১ইং সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি সর্বাত্মক সমর্থন প্রদান করেন এবং প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেনশিক্ষা ও সমাজ সংস্কারঃ-রাজনীতির পাশাপাশি তিনি শিক্ষার প্রসারে ব্যাপক অবদান রাখেন।
তিনি টাঙ্গাইলের সন্তোষে ‘মাওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজ’ এবং ‘উইমেন্স কলেজ’সহ বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। আমৃত্যু তিনি কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের মুক্তির জন্য কাজ করে গেছেন। ১৭’নভেম্বর ১৯৭৬ খ্রি. এই মহান নেতা ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। টাঙ্গাইলের সন্তোষে তাকে সমাহিত করা হয়।
মওলানা ভাসানী কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ না থেকে সারা জীবন গণমানুষের মুক্তির জন্য কাজ করেছেন। তার এই আপোসহীন ও বৈপ্লবিক জীবন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে ।

