আমিনুল ইসলাম খন্দকার,
দূর্গম পাহাড়ে বসবাসরত বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মাঝে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে ১৯৯৪ সালে বান্দরবানের লামা উপজেলায় স্থানীয় উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো টংঙ্গা ঝিরি কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। জাতীয়করণ না হওয়ার হতাশায় শিক্ষকগণ ২০১৩ সালে চাকরি ছেড়ে চলে গেলে বিদ্যালয়টির বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে ওই এলাকায় শিশু শিক্ষার্থী বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদ্যালয়টি পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
টংঙ্গা ঝিরি কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি উপজেলার সরই ইউনিয়নের ৮ নাম্বর ওয়ার্ড টংঙ্গা ঝিরি ত্রিপুরা পাড়ায় অবস্থিত।
টংগা ঝিরি পাড়া, মারিয়া পাড়া, নতুন টংগঝিরি পাড়া, ছবিচন্দ্র ত্রিপুরা পাড়া, ফুইট্টাঝিড়ি পাড়া, পন্দঝিরি পাড়া ও মাঝের বেতছড়া পাড়াসহ ছয়টি পাড়ার বাসিন্দাদের শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার জন্য বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। বর্তমানে শুধুমাত্র টংঙ্গা ঝিরি ত্রিপুরা পাড়ায় ১১৬ টি পরিবার রয়েছে। এসব পরিবারে কয়েক শতাধিক শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনার উপযোগী রয়েছে। তাদের মধ্যে সামান্য সংখ্যক শিশু টংঙ্গা ঝিরি পাড়া থেক তিন কিলোমিটার দূরে কম্পোনিয়া পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করে। দূর্গম ও দূরবর্তী হওয়ার কারনে অধিকাংশ শিক্ষার্থী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়মিত যাওয়া আসা করে না। ফলে এই এলাকাগুলোর শিশুরা প্রাথমিকের গন্ডি পার হওয়ার আগেই পড়াশোনা থেকে ঝড়ে পরছেন।
সরেজমিনে টংঙ্গা ঝিরি কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ঘুরে দেখা গেছে, মাঠে ধান শুকাতে দিয়েছেন কয়েকজন পাহাড়ি সম্প্রদায়ের নারী। কিছুক্ষণ পর বস্তাবন্দি করে ধানের বস্তাগুলো স্কুলের কক্ষে রেখে দিচ্ছেন। পুরাতন জরাজীর্ণ একটি চার কক্ষের পাঁকা স্কুল ভবন। এর মধ্যে দুইটি কক্ষের দরজা জানালা ভাঙ্গা। তবে পরিচ্ছন্ন রয়েছে কক্ষগুলো। এই দুইটি কক্ষে বিদ্যালয় সংলগ্ন টংগা ঝিরি ত্রিপুরা পাড়ার বাসিন্দারা ধান চাউলসহ শুকনো খাবার সংরক্ষণ করেন। অপর দুইটি কক্ষ তালাবদ্ধ রয়েছে। যার মধ্যে একটির জানালা খোলা থাকায় দেখা গেলো কাঠের তৈরি চার স্তরের মাচার উপর সারি সারি ভাবে মাশরুম পেকেট রেখে চাষ করা হচ্ছে। অপর কক্ষ তালাবদ্ধ থাকায় সেই কক্ষে কি আছে তা দেখা যায়নি। তবে পাড়াবাসি থেকে জানা গেছে ভবনটি সকলে মালমাল রাখার কাজে ব্যবহার করেন।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৪ সালে টংঙ্গা ঝিরি কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি স্থানীয় উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই সময় প্রধান শিক্ষকসহ ছয় জন শিক্ষক নিয়োগ দেয় স্থানীয় পাড়াবাসী ও জনপ্রতিনিধিরা। পরবর্তীতে ২৫ নভেম্বর ২০০২ সালে এলজিইডি’র অর্থায়নে একটি পাকা ভবন নির্মাণ করা হয়। যেটি তৎকালীন লামা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা কিশালয় চক্রবর্তী উদ্বোধন করেন। সেই সময় নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকগণ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি থেকে নাম মাত্র কিছু টাকা সম্মানি পেতেন, সাথে সরকারি তহবিল থেকে কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য নির্ধারিত ৫০০ টাকা ভাতা প্রাপ্ত হতেন। বান্দরবানে ২০১৩ সালে কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়। সেই সময় টংঙ্গা ঝিরি কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ কারা হয়নি। ফলে সেখানে কর্মরত শিক্ষককরা হতাশ হয়ে চাকরি ছেড়ে চলে যায়। তখন থেকে বন্ধ হয়ে যায় বিদ্যদলয়টি। তবে কি কারণে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ হয়নি এবং সেই সময় কারা সেখানে কর্মরত ছিলেন সেই বিষয়ে লামা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে তখনকার কোন তথ্য পাওয়া যায়নি।
টংঙ্গা ঝিরি ত্রিপুরা পাড়ার কারবারি বিরেন্দ্র ত্রিপুরা বলেন, আমাদের এই পাড়ায় বসবাসরত ১১৬ টি পরিবার রয়েছে। এছাড়া আশেপাশে আরও ছয়টি টি পাড়ার জন্য একমাত্র টংঙ্গা ঝিরি কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ছিলো। সেটি জাতীয়করণ না হওয়ায় শিক্ষকরা চাকরি ছেড়ে দিলে বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে যায়। আমরা পাড়াবাসী শিক্ষকদের ঠিকমতো বেতন দিতে পারতাম না। ফলে বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে গেছে।
একই পাড়ার বাসিন্দা এরোমনি ত্রিপুরা বলেন, বিদ্যালয়টি ১২ বছর ধরে বন্ধ থাকার কারনে আমাদের পাড়ার শিশু শিক্ষার্থীরা তিন থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে কোম্পানিয়া ও সড়ইসহ দূর দূরান্তে যেতে হচ্ছে। দুর্গম যাতায়াতের কারনে এতে খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অধিকাংশ শিশুদের অভিভাবকরা বিদ্যালয়ে পাঠাতে না পারার কারনে প্রাথমিক শিক্ষা থেকে ঝড়ে পড়ছে।
তৎকালীন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য রায়হেল ত্রিপুরা বলেন, দূর্গম জনপদ হওয়ায় যাতায়াতে অসুবিধা, সেই সাথে সুপেয় পানির কষ্ট এই এলাকায়। এছাড়া শিক্ষকদের ঠিকমতো বেতন দেওয়া সম্ভব হয়নি। সেই সময় আমরা পাড়াবাসী মিলে বিদ্যালয়ের ভবন ও মাঠের জন্য জায়গা দিয়েছি। ভবিষ্যতে এই বিদ্যালয় পুনরায় চালু হবে সেই আশায় ওই যায়গাটি এখনো খালি রেখেছি। কোন স্থাপনা তৈরি করিনি। আমরা সরকারি সহায়তায় পুনরায় বিদ্যালয়টি চালুর দাবি জানাচ্ছি।
বিদ্যালয়টি পুনরায় চালুর বিষয়ে জানতে চাইলে লামা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার দেবাশিস বিশ্বাস বলেন, টংঙ্গা ঝিরি পাড়ার বাসিন্দারা আমাদের সাথে যোগাযোগ করেছেন। যেহেতু আশেপাশে বিদ্যালয় নেই তাই পুনরায় সেটি চালু করা যাবে। আমরা তাদের বিদ্যালয় পরিচালনা করতে যে নীতিমালা প্রয়োজন তার একটি কপি দিয়েছি। সেই অনুযায়ী তারা বিদ্যালয়টি পুনরায় চালু করতে পারবে। এ বিষয়ে আমি তাদের সব ধরনের সহযোগিতা করবো।

