মো: এ কে নোমান, নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি:
যে হাতে ঠিকমতো কলম ধরা যায় না, সেই হাতেই অনায়াসে চলে কম্পিউটারের কিবোর্ড। যে পায়ে ভর করে স্বাভাবিকভাবে হাঁটা সম্ভব নয়, সেই পায়েই প্রতিদিন পৌঁছে যান শ্রেণিকক্ষে। স্পষ্ট করে কথা বলতে পারেন না, চলাফেরাও কষ্টসাধ্য। কিন্তু এসব সীমাবদ্ধতা তার স্বপ্নকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। প্রতিকূলতার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করেই একদিন দক্ষ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার হয়ে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নিজের অবস্থান গড়ে তোলার স্বপ্ন বুনে চলেছেন নওগাঁ সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের তৃতীয় পর্বের শিক্ষার্থী নিশাদ আনান সিনহা।
জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের বেলখুর গ্রামের বাসিন্দা নিশাদ আনান সিনহা। বাবা মো. মাসুদ ইবনে কামাল ও মা মোছা. শান্তনা খাতুন। জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তার জীবনের সঙ্গী। অন্যদের মতো দৌড়ে বেড়ানো, সহজে হাঁটা কিংবা স্বাভাবিকভাবে লিখতে পারার সুযোগ তার ভাগ্যে জোটেনি। কলম ধরতে পারলেও দীর্ঘ সময় ধরে লিখতে পারেন না। কথাও স্পষ্টভাবে বলতে পারেন না। তবুও কোনোদিন নিজের ভাগ্যকে দোষ দিয়ে বসে থাকেননি। বরং প্রতিটি সীমাবদ্ধতাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন।
শৈশব থেকেই প্রযুক্তির প্রতি ছিল তার গভীর আগ্রহ। বাড়িতে একটি কম্পিউটার থাকায় ছোটবেলা থেকেই সেটি নিয়ে নাড়াচাড়া করতেন। বাবা ও চাচাদের কম্পিউটার ব্যবহার করতে দেখে সেখান থেকেই প্রযুক্তির জগতে তার হাতেখড়ি। এরপর ২০২১ সালে বাড়িতে ইন্টারনেট সংযোগ পাওয়ার পর যেন খুলে যায় নতুন সম্ভাবনার দুয়ার। ইউটিউবকে শিক্ষক বানিয়েই শুরু করেন শেখার পথচলা। ধীরে ধীরে প্রোগ্রামিং, ওয়েব ডিজাইন, ওয়েব ডেভেলপমেন্টসহ বিভিন্ন বিষয়ে নিজেই শিখতে থাকেন।
২০২৪ সালে নিকড়দীঘি নান্দুলা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৪.৬৮ অর্জন করেন সিনহা। এরপর কম্পিউটার প্রযুক্তির প্রতি ভালোবাসা থেকেই ভর্তি হন নওগাঁ সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগে। বর্তমানে তিনি তৃতীয় পর্বের একজন শিক্ষার্থী।
পড়াশোনার সুবিধার্থে ইনস্টিটিউটের আশপাশের একটি মেসে থাকেন তিনি। প্রতিদিন দুপুর থেকে তার ক্লাস শুরু হয়। কিন্তু ক্লাসে পৌঁছানোও তার জন্য সহজ নয়। অনেক সময় সহপাঠীরা হাত ধরে তাকে মেস থেকে শ্রেণিকক্ষে নিয়ে আসেন। ক্লাস শেষে আবার পৌঁছে দেন মেসে। বাজারে যাওয়া, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনা কিংবা বাইরে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার সময়ও বন্ধুরা তার পাশে থাকেন। এই বন্ধুত্ব আর সহযোগিতাই তাকে প্রতিদিন নতুন করে সাহস জোগায়।
শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে তাত্ত্বিক পরীক্ষায় লেখালেখি তার জন্য কঠিন হলেও ব্যবহারিক ক্লাসে তিনি অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দেন। বিশেষ করে প্রোগ্রামিংয়ে তার পারদর্শিতা শিক্ষক ও সহপাঠীদের মুগ্ধ করেছে। বিভিন্ন ধরনের ওয়েবসাইট ও ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন তৈরির কাজ করেন তিনি। ইতোমধ্যে ওয়ার্ডপ্রেস ব্যবহার করে একটি ব্যক্তিগত পোর্টফোলিও ওয়েবসাইট তৈরি করেছেন। এছাড়া আরও কয়েকটি ছোট প্রজেক্ট সম্পন্ন করেছেন, যা একজন শিক্ষার্থী হিসেবে তার প্রযুক্তিগত দক্ষতারই প্রমাণ।
নিশাদ আনান সিনহা বলেন, “আমি ইউটিউব দেখে দেখে বিভিন্ন ধরনের কাজ শিখেছি। ছোটবেলা থেকেই বাড়িতে একটি কম্পিউটার ছিল। বাবা ও চাচাদের কম্পিউটার চালাতে দেখে আমার আগ্রহ তৈরি হয়। পরে ২০২১ সালে বাড়িতে ইন্টারনেট সংযোগ আসার পর নিয়মিত ইউটিউব দেখে শেখা শুরু করি। এখন প্রোগ্রামিং, ডিজাইনিং ও ওয়েব ডেভেলপমেন্ট শিখছি। এর মধ্যে কয়েকটি প্রজেক্ট সম্পন্ন করেছি। ওয়ার্ডপ্রেসের মাধ্যমে একটি পোর্টফোলিও ওয়েবসাইটও তৈরি করেছি। প্রতিদিন নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করি।”
তিনি আরও বলেন, “আমার অনেক কিছু শেখার ইচ্ছা আছে। কিন্তু সব সময় সুযোগ হয় না। কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি যদি আমাকে বাস্তব কাজ শেখার সুযোগ করে দেন বা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন, তাহলে আমি আরও দক্ষ হতে পারব। আমার স্বপ্ন ডিপ্লোমা শেষ করে একজন দক্ষ ফুল-স্ট্যাক ডেভেলপার হওয়া এবং ভালো কোনো প্রতিষ্ঠানে সফটওয়্যার ডেভেলপার হিসেবে কাজ করা। আমি চাই মানুষ আমার প্রতিবন্ধকতাকে নয়, আমার কাজকে মনে রাখুক।”
সহপাঠী হোসাইন কবির বলেন, “সিনহা আমাদের কাছে অনুপ্রেরণার নাম। আমরা কেউ তাকে করুণা করি না, বরং তাকে নিয়ে গর্ব করি। ক্লাসে যাওয়া-আসার সময় আমরা তাকে সহযোগিতা করি। কিন্তু পড়াশোনার ক্ষেত্রে অনেক সময় উল্টো ও-ই আমাদের সহযোগিতা করে। বিশেষ করে প্রোগ্রামিংয়ে ও অনেক দক্ষ। কোনো সমস্যা হলে আমরা ওর কাছেই যাই। এত কষ্টের মধ্যেও ওকে কখনো হতাশ হতে দেখিনি। সব সময় হাসিমুখে থাকে এবং নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করে। আমরা বিশ্বাস করি, একদিন সে একজন সফল সফটওয়্যার ডেভেলপার হবে।”
কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি একজন শিক্ষক আবু হাসান বলেন, “নিশাদ আনান সিনহা অত্যন্ত মেধাবী, ভদ্র এবং পরিশ্রমী একজন শিক্ষার্থী। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও সে কখনো নিজের সীমাবদ্ধতাকে অজুহাত বানায়নি। নিয়মিত ক্লাস করে, ব্যবহারিক কাজে অংশ নেয় এবং নতুন নতুন প্রযুক্তি শেখার আগ্রহ সব সময় তার মধ্যে দেখা যায়। বিশেষ করে প্রোগ্রামিংয়ে তার দক্ষতা প্রশংসার দাবিদার। একজন শিক্ষক হিসেবে আমরা তার জন্য গর্ববোধ করি। যথাযথ সুযোগ ও সহযোগিতা পেলে সে অবশ্যই একজন দক্ষ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে অবদান রাখতে পারবে।”
কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির দ্বিতীয় শিফটের বিভাগীয় প্রধান মো. মিজানুর রহমান বলেন, “সিনহার গল্প আমাদের শেখায় যে, মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তার ইচ্ছাশক্তি। প্রতিদিন নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতার সঙ্গে যুদ্ধ করেও সে নিয়মিত ক্লাসে আসে, ল্যাবে কাজ করে এবং নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তুলছে। তার শেখার আগ্রহ ও অধ্যবসায় সত্যিই প্রশংসনীয়। সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং সরকার যদি এমন মেধাবী প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে তারা শুধু নিজের জীবনই বদলাবে না, দেশের উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আমরা তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি।”
শিক্ষকদের মতে, প্রযুক্তি খাতে এখন দক্ষতার মূল্যায়নই সবচেয়ে বেশি। তাই সঠিক প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে কাজ করার সুযোগ এবং কর্মক্ষেত্রে সহযোগিতা পেলে সিনহার মতো শিক্ষার্থীরা নিজেদের মেধা দিয়ে দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।
প্রতিদিন দুপুরে যখন সহপাঠীদের হাত ধরে ধীরে ধীরে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেন নিশাদ আনান সিনহা, তখন হয়তো অনেকেই শুধু একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে দেখেন। কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে আছে একজন স্বপ্নবাজ তরুণ, যার চোখে ভবিষ্যতের অসংখ্য স্বপ্ন। যে হাত দিয়ে সুন্দর করে লেখা যায় না, সেই হাতই আজ প্রযুক্তির ভাষায় ভবিষ্যৎ লিখছে। যে পায়ে দ্রুত হাঁটা যায় না, সেই পায়েই এগিয়ে চলেছেন সাফল্যের পথে।
নিশাদ আনান সিনহার গল্প কেবল একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত সংগ্রামের গল্প নয়; এটি অদম্য ইচ্ছাশক্তি, অধ্যবসায়, বন্ধুত্ব, শিক্ষকদের অনুপ্রেরণা এবং স্বপ্নকে জয় করার গল্প। সমাজ যদি তার মতো মেধাবী ও সংগ্রামী তরুণদের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে একদিন তারাই দেশের প্রযুক্তি খাতকে আরও সমৃদ্ধ করবে। কারণ প্রতিবন্ধকতা কোনো মানুষের পরিচয় নয়-পরিচয় তার মেধা, পরিশ্রম এবং স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সাহস।

