ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কার, প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিচার এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজধানী দিল্লি। ব্যঙ্গাত্মক একটি অনলাইন উদ্যোগ থেকে শুরু হওয়া তরুণদের সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP) আজ দেশের অন্যতম প্রভাবশালী ও আলোচিত রাজনৈতিক ও সামাজিক তরুণ আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।
আজ বুধবার (২২ জুলাই ২০২৬) আন্দোলনের অন্যতম মুখপাত্র সৌরভ দাস জানিয়েছেন, তাঁরা সরকারের সঙ্গে সংলাপে বসতে পুরোপুরি প্রস্তুত। তবে কোনো সরকারি দপ্তর বা মন্ত্রীর বাসভবনে নয়—যন্তর মন্তর কিংবা যেকোনো নিরপেক্ষ স্থানে এই আলোচনা হতে হবে। তিনি স্পষ্ট করেন, শুরু থেকেই আন্দোলনকারীরা আলোচনার মাধ্যমেই সমাধানের পক্ষে ছিলেন।
বিবিসির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েক মাস আগে রাজনৈতিক যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী অভিজিৎ দীপক নিছক মজা করেই ইনস্টাগ্রাম ও এক্স (সাবেক টুইটার)-এ ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে আইডি খোলেন। পরবর্তীতে সদস্যপদের নিবন্ধন ফরম প্রকাশ করলে মুহূর্তেই হাজার হাজার তরুণ এতে নাম লেখান।
ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি বক্তব্যকে ব্যঙ্গ করেই আন্দোলনের এই বিদ্রূপাত্মক নামকরণ। একটি আইনি শুনানিতে ভুয়া সনদধারী কিছু ব্যক্তিকে তিনি ‘ককরোচ’ বা তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করেন। পরবর্তীতে তিনি ব্যাখ্যা দেন যে, এই মন্তব্য দেশের সব তরুণদের উদ্দেশ্যে ছিল না। তবে এই শব্দটিকে প্রতীকী রূপ দিয়ে আন্দোলনকারীরা এর নাম রাখেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’।
চলতি বছরের উচ্চ প্রতিযোগিতামূলক চিকিৎসা শিক্ষার প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রায় ২২ লাখ ৮০ হাজার শিক্ষার্থী অংশ নেন। পরীক্ষা শেষে ভয়াবহ প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উঠলে তা বাতিল করে নতুন করে পরীক্ষা নিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ: বারবার পরীক্ষা বাতিল ও দুর্নীতির ফলে সৃষ্টি হওয়া চরম মানসিক চাপে এ পর্যন্ত অন্তত ২০ জন পরীক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন।
মূল দাবি—ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের জবাবদিহি, পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্ব পদত্যাগ।
২৮ জুন দিল্লির যন্তর মন্তরে সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক অনশন শুরু করলে আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ হয়। পুলিশ তাঁকে জোর করে হাসপাতালে পাঠালেও তিনি এখনো অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন।
গত ১৯ জুলাই সংসদ অভিমুখে ‘সংসদ চলো’ পদযাত্রায় দিল্লির রাজপথে নামেন হাজার হাজার শিক্ষার্থী। গত সোমবার (২০ জুলাই) শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করলে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই ভাঙচুর ও সহিংসতার অভিযোগে দিল্লি পুলিশ এ পর্যন্ত ৬টি মামলা দায়ের করেছে।
তবে দমন-পীড়ন সত্ত্বেও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সিজেপি। প্রস্তাবিত ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির প্রতিবাদে থাকা শত শত কৃষক নিজেদের গরু-মহিষ নিয়ে দিল্লির দিকে রওনা হয়েছেন এবং পাঞ্জাবের হাজারও শিখ ও আমজনতা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি জানাতে দিল্লিমুখী যাত্রা শুরু করেছেন।
শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন ভারতের বিরোধী দলগুলোর ব্যাপক সমর্থন পেয়েছে। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি লাঠিচার্জের তীব্র নিন্দা জানিয়ে সরকারের জবাবদিহি দাবি করেছেন।
অন্যদিকে ক্ষমতাসীন জোটের সংসদীয় বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জানান, প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ওঠার পর সরকার দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নিয়ে ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং তরুণদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে অতি দ্রুত পুনর্পরীক্ষা নিয়ে ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তির আশ্বাস দেন তিনি।
রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ ও নেপালের সাম্প্রতিক ‘জেন-জি’ (Gen-Z) গণঅভ্যুত্থান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ভারতের তরুণ সমাজ আজ নিজেদের অধিকার আদায়ে এমন অভূতপূর্ব রাজপথের লড়াই গড়ে তুলেছে।

