সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় দীর্ঘ ৪৫ বছর পলাতক থাকার পর গ্রেপ্তার হয়েছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোজাফফর হোসেন। বুধবার (১৫ জুলাই) রাতে রাজধানীর বনানীর একটি বাসা থেকে তাকে আটক করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরদিন বৃহস্পতিবার তাকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে তার বয়স ৭৭ বছর।
ডিএমপির তথ্যমতে, গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তির সহায়তায় তার অবস্থান শনাক্ত করে অভিযান চালানো হয়। জিজ্ঞাসাবাদে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর সশস্ত্র বাহিনী বিভাগকে বিষয়টি জানানো হয় এবং পরে তাকে মিলিটারি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ডিএমপি তাকে জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার পলাতক আসামি হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে তার বিরুদ্ধে বর্তমানে কী ধরনের আইনি বা সামরিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণা ও ঐতিহাসিক গ্রন্থে মোজাফফরের নাম উঠে এসেছে। সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের Bangladesh: A Legacy of Blood বইয়ে দাবি করা হয়েছে, ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে জিয়াউর রহমান কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলে তার কাছাকাছি অবস্থান করছিলেন মেজর মোজাফফর ও লেফটেন্যান্ট মোসলেহউদ্দিন। বইটিতে বর্ণনা করা হয়েছে, সে সময় মোজাফফর দৃশ্যত বিচলিত ছিলেন এবং ধারণা করেছিলেন জিয়াকে হত্যা নয়, কেবল আটক করা হবে।
বইটির ভাষ্য অনুযায়ী, কিছুক্ষণ পর লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান গুলি চালান। পরবর্তী সময়ে মোজাফফর নাকি তার সহকর্মীকে বলেছিলেন, রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করা হবে—এমন পরিকল্পনার কথা তিনি জানতেন না। তবে এসব তথ্য বইয়ের লেখকের বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে; এগুলো আদালতে যাচাইকৃত সাক্ষ্য নয়।
একই বইয়ে আরও দাবি করা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পর মোজাফফরসহ কয়েকজন কর্মকর্তা পুনরায় সার্কিট হাউসে গিয়ে বিভিন্ন নথিপত্র ও ব্যক্তিগত ডায়েরি খুঁজে দেখেন এবং পরে মরদেহ সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রমে অংশ নেন। এছাড়া চট্টগ্রাম সেনানিবাসে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকেও তার উপস্থিতির উল্লেখ রয়েছে।
অন্যদিকে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরীর স্মৃতিকথায় উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে ব্যাংককে পলাতক মেজর খালেদ ও মোজাফফরের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়েছিল। সেখানে তারা দাবি করেছিলেন, মূল পরিকল্পনা ছিল জিয়াউর রহমানকে সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়া, হত্যা করা নয়। তবে এই বক্তব্যও স্বাধীনভাবে যাচাই হয়নি এবং আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য নয়।
জিয়া হত্যা মামলায় বিচার শেষে ১৮ সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রায় দেওয়া হলেও মোজাফফর দীর্ঘদিন পলাতক ছিলেন। সম্প্রতি তার গ্রেপ্তারের পর মামলাটি আবারও আলোচনায় এসেছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, তার জবানবন্দি থেকে ওই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ, পরিকল্পনা এবং দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার বিষয়সহ বহু অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে।
তবে মামলার বিষয়ে চূড়ান্ত সত্য নির্ধারণের দায়িত্ব আদালত ও তদন্তকারী সংস্থার। ঐতিহাসিক বইয়ে উল্লেখিত দাবি কিংবা বিভিন্ন ব্যক্তির বর্ণনা এখনো বিচারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে বিবেচিত নয়।

