রাজধানীর মোহাম্মদপুরের দুই কিশোরের দিনের বড় একটি অংশ কাটে স্মার্টফোনের পর্দায়। তাদের ইচ্ছা মাঠে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করা। কিন্তু আশপাশে খেলার মতো কোনো উন্মুক্ত জায়গা নেই। একই চিত্র মিরপুর, উত্তরা, পুরান ঢাকা কিংবা দেশের অনেক শহরেই। ফলে খেলাধুলার বদলে মোবাইল, ট্যাব ও টেলিভিশনই হয়ে উঠছে শিশু-কিশোরদের প্রধান সঙ্গী।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালায় প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলার মাঠ থাকার কথা থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সারা দেশে ১৫ হাজারেরও বেশি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিজস্ব খেলার মাঠ নেই। রাজধানীর অধিকাংশ বেসরকারি স্কুল গড়ে উঠেছে ছোট ভবন, গ্যারেজ কিংবা ছাদের ওপর, যেখানে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার কোনো সুযোগ নেই।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার ৩৪২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৫২টিতেই খেলার মাঠ নেই। অন্যদিকে রাজধানীর বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ৯৮ শতাংশই মাঠবিহীন। একই সমস্যা দেশের বিভাগীয় শহরগুলোর বহু স্কুল-কলেজেও রয়েছে। এমনকি অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইংরেজি মাধ্যম স্কুলেও শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার ব্যবস্থা নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাঠের অভাবে শিশুদের স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তারা অবসর সময় কাটাচ্ছে স্মার্টফোন, ট্যাব, কম্পিউটার কিংবা স্মার্ট টিভির সামনে। এতে একদিকে যেমন ডিভাইসের প্রতি নির্ভরশীলতা বাড়ছে, অন্যদিকে কমছে সামাজিক মেলামেশা, সৃজনশীলতা ও শারীরিক সক্ষমতা।
২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলাধুলা ও শরীরচর্চার উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া চলতি বছরের ২৫ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয় নির্দেশনা দেয়, বিদ্যালয়ের পাঠ শেষে এবং ছুটির দিনে স্কুলের মাঠ স্থানীয় শিশু-কিশোরদের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। কিন্তু বাস্তবে অনেক স্কুলে মাঠ থাকলেও তা তালাবদ্ধ রাখা হয় অথবা অন্য কাজে ব্যবহার করা হয়।
রাজধানীর কয়েকটি মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও অবৈধ দখল, কোথাও বাজার, গাড়ির হাট কিংবা নির্মাণসামগ্রী রাখার কারণে মাঠগুলো শিশুদের ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ফলে উন্মুক্ত জায়গার সংকট দিন দিন আরও প্রকট হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানদণ্ড অনুযায়ী, একজন মানুষের জন্য অন্তত ৯ বর্গমিটার খোলা জায়গা প্রয়োজন। অথচ ঢাকা মহানগরে জনপ্রতি খোলা জায়গা এক বর্গমিটারেরও কম। ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)-এর গবেষণা বলছে, ঢাকার আয়তন অনুযায়ী অন্তত ৬১০টি খেলার মাঠ থাকা প্রয়োজন হলেও বর্তমানে রয়েছে মাত্র ২৩৫টি।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীর স্কুলপড়ুয়া শিশুরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইসের পর্দার সামনে কাটায়। এর ফলে ঘুমের সমস্যা, স্থূলতা, চোখের অসুবিধা, মাথাব্যথা এবং মানসিক চাপের ঝুঁকি বাড়ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আবদুল হালিম বলেন, একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য খেলার মাঠ অপরিহার্য। খেলাধুলা শুধু শরীরচর্চা নয়, এটি নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা, দলগত কাজ এবং মানসিক বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই মাঠবিহীন শিক্ষা ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে শিশুদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
এদিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, দেশের প্রায় ৬৬ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ উন্নয়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নতুন বেসরকারি বিদ্যালয়ের অনুমোদনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত মানের খেলার মাঠ নিশ্চিত করার বিষয়েও সরকার কাজ করছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, শুধু নীতিমালা প্রণয়ন করলেই হবে না, তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, খেলার মাঠ হারিয়ে গেলে শিশুদের শৈশবও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে—আর সেই শূন্যস্থান পূরণ করবে মোবাইলের পর্দা ও ভার্চুয়াল জগত।

