গৌরীপুর (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি:
ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলায় গত ১০ দিনে তিনটি পৃথক হত্যাকাণ্ড, ধারাবাহিক চুরি, মোটরসাইকেল ও গরু চুরির ঘটনায় জনমনে চরম উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। কিশোর গ্যাং, মাদক সংশ্লিষ্ট অপরাধ এবং সংঘবদ্ধ চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনায় উপজেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ভাংনামারী ইউনিয়নের বারুয়ামারী গ্রামের গার্মেন্টকর্মী আলিফ আহাম্মদ (২২) হত্যা। পুলিশ জানিয়েছে, বন্ধুকে দাওয়াত দেওয়ার আগেই তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গাজীপুরের কোনাবাড়ি থেকে ছুরি কিনে আনেন অভিযুক্ত মেহেদী হাসান (৩৮)।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, আলিফ ও মেহেদী গাজীপুরে একসঙ্গে কাজ করতেন। আলিফ একটি মেস পরিচালনা করতেন, যেখানে ২০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে অংশীদার হন মেহেদী। প্রথমদিকে লাভের টাকা পেলেও পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। একপর্যায়ে মূলধনের টাকাও অস্বীকার করেন আলিফ। এ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে ২৪ জুন আলিফকে নিজ বাড়িতে দাওয়াত দেন মেহেদী। ওই রাতেই টাকা নিয়ে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে ছুরিকাঘাতে তাকে হত্যা করা হয়।
পরদিন ২৫ জুন সকালে গৌরীপুর থানা পুলিশ বারুয়ামারীর একটি বেগুনক্ষেত থেকে আলিফের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই মো. আরিফ রানা বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
পরে গ্রেফতার হওয়া মেহেদী হাসান আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যার পরিকল্পনা ও ঘটনার বর্ণনা দেন।
এদিকে একই ইউনিয়নের দুর্বারচর গ্রামে গত ৫ জুলাই রাতে বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে আব্দুল বারেক আকন্দ ওরফে মজনু মুন্সি (৪৫) দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন। নিহতের স্বজনদের দাবি, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা পথরোধ করে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। এ ঘটনায় মঙ্গলবার রাতে রাকিব নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
অন্যদিকে পৌর শহরের মোটরযান শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি মানিক মিয়া হত্যাকাণ্ডেও এখনও প্রধান আসামিদের গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। নিহতের স্ত্রী মোছা. সুমাইয়া আক্তার সেলিনা বাদী হয়ে ২ জুলাই শোয়েব মুন্সী, অলি মুন্সী, নূহ মুন্সী, আল ইমরান খান, হাদীস মিয়া, উজ্জ্বল মিয়া, রিফাত খান, জুনায়েদসহ নয়জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতনামা পাঁচজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, জমি-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে ৩০ জুন রাতে বাসস্ট্যান্ড থেকে মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে মানিক মিয়াকে রড ও হাতুড়ি দিয়ে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তবে ঘটনার কয়েকদিন পেরিয়ে গেলেও আসামিরা গ্রেফতার না হওয়ায় নিহতের পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
শুধু হত্যাকাণ্ডই নয়, সাম্প্রতিক সময়ে গৌরীপুরে চুরি ও চুরির চেষ্টার ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে।
গত ৭ জুলাই ভোরে পৌর শহরের পুরাতন সিনেমা হল সড়কে একটি বাসা থেকে আইপিএস, ব্যাটারি ও প্রায় ৬০ হাজার টাকা চুরি হয়। একই এলাকায় আরেকটি বাসায় চুরির চেষ্টা চালানো হয়। কালিপুর বাজার এলাকায় একটি বাড়ি থেকে মোবাইল ফোন, স্বর্ণালংকার ও অন্যান্য মালামালসহ প্রায় দুই লাখ টাকার সম্পদ চুরি হয়েছে।
এছাড়া ৩০ জুন সহনাটী ইউনিয়নের পাছার বাজার থেকে একটি ১২৫ সিসি মোটরসাইকেল চুরি হয়। একই রাতে পৌর শহরের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে প্রায় দেড় লাখ টাকার মালামাল চুরি হয়েছে। বোকাইনগর, রামগোপালপুর ও ডৌহাখলা ইউনিয়নে গত তিন মাসে অন্তত ৪৭টি গরু চুরির ঘটনা ঘটেছে। মাছুয়াপাড়া এলাকার একটি মসজিদের গ্রিল কেটে ব্যাটারি ও দানবাক্সের টাকা চুরির ঘটনাও স্থানীয়দের উদ্বিগ্ন করেছে।
এদিকে মোটরসাইকেল চুরির অভিযোগে গৌরীপুর থেকে তিনজনকে গ্রেফতার করেছে পিবিআই।
গৌরীপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. হাবিবুর রহমান বলেন, “বারুয়ামারী হত্যাকাণ্ডের রহস্য দ্রুত উদ্ঘাটন করে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় আসামিদের গ্রেফতার করা হয়েছে। দুর্বারচর হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে একজনকে আটক করা হয়েছে। চালক মানিক মিয়া হত্যা মামলার আসামিদের গ্রেফতারের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড এবং চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনায় সাধারণ মানুষ দ্রুত অপরাধীদের গ্রেফতার ও কার্যকর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।

