টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এবং পার্বত্যাঞ্চলে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে। ৪২ বছরের ইতিহাসের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত ও নজিরবিহীন জলাবদ্ধতায় থমকে গেছে চট্টগ্রাম মহানগরী। কক্সবাজার, রাঙ্গুনিয়া, রাঙামাটি ও বান্দরবানে পাহাড়ধস, গাছ উপড়ে এবং পানিতে ডুবে এ পর্যন্ত অন্তত ১৪ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন, বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে একাধিক জেলার সড়ক যোগাযোগ। বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আজকের (বুধবার) এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।
গত দুদিনের টানা বৃষ্টি ও ভূমিধসে বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে:
জেলায় পাহাড়ধস ও বৃষ্টিজনিত বিভিন্ন দুর্ঘটনায় গত দুই দিনে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে ৮ জন, শহরের ছাত্তারঘোনায় ১ জন, পেকুয়ায় মাটির ঘর ধসে ১ শিশু এবং সবশেষ মঙ্গলবার দুপুরে সদরের দরিয়ানগর বড়ছড়া এলাকায় পাহাড়ধসে লিমা আক্তার (২৫) নামের এক গৃহবধূ নিহত হন।
রাঙ্গুনিয়া (১ জনের মৃত্যু): উপজেলায় পাহাড়ধসে রেণু আক্তার নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে এবং আরও দুজন আহত হয়েছেন।
রাঙামাটি (১ জনের মৃত্যু): মঙ্গলবার সকালে জমিতে কাজ করার সময় পাহাড় থেকে গাছ উপড়ে পড়ে লক্ষ্মী বিলাস চাকমা (৭০) নামে এক বৃদ্ধ মারা গেছেন।
বান্দরবান (১ শিশুর মৃত্যু): বাইশারী ইউনিয়নের রাঙ্গাঝিরিছড়ায় বন্যার পানির তীব্র স্রোতে ভেসে গিয়ে আলিয়া সুলতানা (৫) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
চট্টগ্রাম মহানগরী ও এর আশপাশের এলাকাগুলো এখন পানির নিচে। চসিক তাদের আওতাধীন ৪৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মঙ্গলবার ক্লাস-পরীক্ষা স্থগিত করে।
বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করতে না পেরে আবুধাবি, শারজাহ ও ঢাকা থেকে আসা তিনটি ফ্লাইট ডাইভার্ট হয়ে ঢাকায় অবতরণ করে।
রেললাইনে তীব্র পানিপ্রবাহের কারণে ষোলশহর স্টেশন এলাকায় কক্সবাজারগামী ‘পর্যটন এক্সপ্রেস’ এবং কক্সবাজার থেকে আসা ‘সৈকত এক্সপ্রেস’ প্রায় ৭ ঘণ্টা আটকে থাকে। এতে চরম বিপাকে পড়েন অন্তত দেড় হাজার যাত্রী।
উদ্ভূত বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের বুধবারে অনুষ্ঠিতব্য এইচএসসি ও সমমানের সব পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে।
খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়ক বন্ধ: মহালছড়ির বিভিন্ন স্থানে সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় খাগড়াছড়ির সাথে রাঙামাটির সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। চেঙ্গী ও মাইনী নদীর পানি বাড়ায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে।
বান্দরবানে ২২০ আশ্রয়কেন্দ্র: সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বাড়ায় শহরের বহু ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে। থানচির রেমাক্রীতে আটকে পড়া শতাধিক পর্যটককে উদ্ধার করা হয়েছে। আগামী ১০ জুলাই পর্যন্ত জেলার সব পর্যটন স্পট বন্ধ ঘোষণা করেছে প্রশাসন।
নগরীর কালীবাড়ি রোড, সদর রোডসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো হাঁটুসমান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী।
ববঙ্গোপসাগর উত্তাল থাকায় পায়রা সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত জারি করা হয়েছে। জীবন বাঁচাতে গভীর সাগর ছেড়ে পাথরঘাটাসহ উপকূলের নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরেছেন সহস্রাধিক জেলে। অন্যদিকে ভোলায় নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে এবং ৬টি রুটে নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে।আবহাওয়াবিদ একেএম নাজমুল হক স্বাক্ষরিত এক সতর্কবার্তায় জানানো হয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আগামী ৪৮ ঘণ্টায় খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, রংপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী (৪৪-৮৮ মিমি) থেকে অতি ভারী (>৮৯ মিমি) বর্ষণ হতে পারে।
পাশাপাশি, আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তিস্তাসহ দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে নীলফামারী, লালমনিরহাটসহ দেশের ১২টি জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

