২০২৬ সালেও ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো অফিশিয়াল পরিকল্পনার কথা প্রতিনিয়ত অস্বীকার করে আসলেও মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে। সামরিক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তেহরানের জন্য এখন আর কোনো অসম্ভব কল্পনার বিষয় নয়। ইরানকে বর্তমানে একটি ‘পরমাণু দোরগোড়ার রাষ্ট্র’ বা নিউক্লিয়ার থ্রেশহোল্ড স্টেট (Nuclear Threshold State) হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
ইরানকে ‘পরমাণু দোরগোড়ার রাষ্ট্র’ হিসেবে মূল্যায়নের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো দেশটির ভল্টে মজুত থাকা ৬০ শতাংশ উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিশাল ভাণ্ডার। সাধারণ বেসামরিক কাজের জন্য যেখানে মাত্র ৩ থেকে ৫ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের প্রয়োজন হয়, সেখানে ৬০ শতাংশের এই মজুত বহুগুণ বেশি।
হামলার আগের মজুত: আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) হিসাব অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার আগে পর্যন্ত ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০.৯ কেজি উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত ছিল।
ক্ষয়ক্ষতির অস্পষ্টতা: সাম্প্রতিক সামরিক হামলায় এই ভাণ্ডারের ঠিক কতটা ক্ষতি হয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে আইএইএ (IAEA)-এর সাবেক প্রধান পরিদর্শক ইউসরি আবু শাদি এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, হামলার আগেই ইরান তাদের উচ্চ সমৃদ্ধ পরমাণু সামগ্রী মাটির গভীরের নিরাপদ বাঙ্কারে সরিয়ে ফেলেছিল। তাঁর মতে, হামলায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মাত্র সামান্য অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বাকি বিশাল অংশের অবস্থান কেবল শীর্ষ সামরিক কমান্ডেরই জানা আছে।
বিশ্লেষক আবু শাদির হিসাব অনুযায়ী, ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ মাত্র ৪২ কেজি ইউরেনিয়ামই একটি প্রাথমিক পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য যথেষ্ট। সেই হিসাবে, তাত্ত্বিকভাবে ইরানের কাছে এই মুহূর্তে প্রায় ১০টি পারমাণবিক বোমা বানানোর মতো পর্যাপ্ত কাঁচামাল রয়েছে。
যদিও নিখুঁত ও বিধ্বংসী অস্ত্রের জন্য ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধকরণের (অস্ত্র-গ্রেড) প্রয়োজন, তবে ৬০ শতাংশের জটিল ধাপটি পার করায় পরবর্তী ৯০ শতাংশে পৌঁছানো ইরানের বর্তমান প্রযুক্তির কাছে স্রেফ কয়েক সপ্তাহের ব্যাপার মাত্র।
বিগত দুই দশক ধরে গবেষণার মাধ্যমে ইরান এক বিশাল পরমাণু বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞ দল গড়ে তুলেছে। দেশজুড়ে সর্বাধুনিক সেন্ট্রিফিউজ প্রযুক্তিসম্পন্ন উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর একটি বড় অংশই মাটির নিচে অত্যন্ত গোপনে কাজ করে চলেছে। রুশ সহায়তায় পরিচালিত বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ বেশ কয়েকটি গবেষণা চুল্লিও তারা পরিচালনা করছে।
সম্প্রতি যুদ্ধবিরতির পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই মন্তব্য করেছেন যে, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মূলত “মাটির গভীর তলদেশে সমাহিত” রয়েছে, যা ধ্বংস করা যেকোনো শক্তির জন্যই অত্যন্ত কঠিন।
পারমাণবিক কাঁচামাল ছাড়াও ইরানের কাছে মাঝারি ও দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইলের এক বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে, যা পরমাণু ওয়ারহেড বহনের প্রধান বাহন হতে পারে। মার্কিন ভিত্তিক ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’ (CSIS)-এর মূল্যায়ন অনুযায়ী, একটি পারমাণবিক বোমাকে সফলভাবে যুদ্ধাস্ত্রে রূপ দিতে হলে তার আকার ও ওজনকে অত্যন্ত ক্ষুদ্র বা মিনিয়াচারাইজড করে মিসাইলের মাথায় ফিট করার উপযোগী করতে হয়। ইরান যদি এই প্রযুক্তিতে সফল হয়, তবে তাদের মিসাইল বাহিনী পুরো অঞ্চলের জন্য এক মারাত্মক পরমাণু হানা দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করবে।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস (CFR): আমেরিকার এই বিখ্যাত থিংক ট্যাংকের দাবি, ইরানের কাছে এই মুহূর্তে হয়তো তৈরি কোনো পরমাণু বোমা নেই। তবে রাজনৈতিক সবুজ সংকেত পেলে তেহরান তাদের কারিগরি দক্ষতা ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তির জোরে অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যেই বোমা বানিয়ে ফেলতে সক্ষম।
ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি (ISIS): এই সংস্থার মতেও ইরানের কাছে পরমাণু কর্মসূচিকে রাতারাতি সামরিক রূপ দেওয়ার মতো সমস্ত সক্ষমতা মজুত রয়েছে।
যদিও উত্তর কোরিয়ার মতো ইরান এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়নি, তবে বিশ্লেষকদের মতে, পরীক্ষা না হওয়াটাই কোনো দেশ পরমাণু অস্ত্রহীন—তার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। নির্দিষ্ট কৌশলগত কারণে একটি দেশ জনসমক্ষে পরীক্ষা না চালিয়েও গোপনে সম্পূর্ণ পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করে বসে থাকতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে কোনোভাবেই ইসরায়েলের বিশাল পারমাণবিক অস্ত্রাগার থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। ইসরায়েল আজ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র অলিখিত পরমাণু-অস্ত্রধারী রাষ্ট্র, যার অস্ত্রাগারে বর্তমানে প্রায় ৮০ থেকে ২০০টি জীবন্ত পারমাণবিক ওয়ারহেড মজুত রয়েছে বলে বিভিন্ন থিংক ট্যাংকের ধারণা।
আন্তর্জাতিক আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড, সিরিয়া ও লেবাননের জমি গায়ের জোরে দখল এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে সামরিক আগ্রাসন চালানো সত্ত্বেও ইসরায়েলের এই পরমাণু সক্ষমতাকে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের কড়া নজরদারি ও বৈশ্বিক জবাবদিহিতা থেকে সবসময় এক অদ্ভুত চাদরে আড়াল করে রাখা হয়।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের পরমাণু কর্মসূচিকে যেখানে তিল তিল করে নজরদারির আওতায় এনে ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়, সেখানে ইসরায়েল কোনো আন্তর্জাতিক বাধা ছাড়াই তাদের পরমাণু সক্ষমতাকে আধুনিক করে চলেছে。 এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থাপনাই আজ বিশ্বমঞ্চে বড় নৈতিক প্রশ্ন তুলেছে।
সামরিক পারমাণবিক সক্ষমতার এই মারাত্মক ইস্যুটি উপসাগরীয় দেশসমূহ, মিশর এবং তুরস্কসহ এই অঞ্চলের প্রতিটি দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সাথে জড়িত। তাই মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের হুমকি দূর করার যেকোনো সৎ ও আন্তরিক প্রচেষ্টার সূচনা হতে হবে সবার আগে ইসরায়েলের বিদ্যমান পরমাণু অস্ত্রাগারকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় আনার মাধ্যমে। এরপরই কেবল সেই ইরানের দিকে আঙুল তোলা মানায়, যে দেশ আজও অন্তত এখন পর্যন্ত কেবল পরমাণু শক্তির দোরগোড়াতেই দাঁড়িয়ে রয়েছে।

