দেশে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি দীর্ঘ হচ্ছে লাশের মিছিল। সরকারি তথ্যমতে, এ পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে সারা দেশে ৫২২ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে শুরু হওয়া ব্যাপক জনসমাগম ও ঈদযাত্রা সংক্রমণ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ১৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে নতুন করে ১২৮ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে ৮৬ জন এবং সন্দেহজনক উপসর্গ নিয়ে ৪৪২ জন—অর্থাৎ মোট ৫২২ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ১৭৪ জন এবং রাজশাহী বিভাগে ৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে দেশে মোট নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ৮ হাজার ৬২২ এবং সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা ৬৩ হাজার ৮১৩ জন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে হামের টিকাদান কর্মসূচি চললেও এখনো ‘হার্ড ইমিউনিটি’ (জনগোষ্ঠীর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা) গড়ে ওঠেনি। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিনের ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান ডা. আরিফা আকরাম বলেন, “ঈদের ছুটিতে অসংখ্য মানুষ ঢাকা ছাড়বে এবং এক-দুই সপ্তাহ পর আবার ফিরবে। এই ব্যাপক স্থানান্তরের ফলে সংক্রমণের বিস্তার গ্রামগঞ্জেও ছড়িয়ে পড়বে, যা পরিস্থিতিকে দীর্ঘমেয়াদী সংকটে ফেলতে পারে।”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, যাদের ছোট শিশু রয়েছে, তাদের এবার ঈদযাত্রা পরিহার করাই উত্তম। কারণ ভ্রমণে বা গ্রামে গিয়ে শিশু আক্রান্ত হলে সেখানে জরুরি ভিত্তিতে উন্নত চিকিৎসা পাওয়া কঠিন হতে পারে।
চিকিৎসা গবেষকদের মতে, হামের টিকার ‘ইমিউন রেসপন্স’ বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরির হার নিয়ে সংশয় রয়েছে। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অনেক শিশু নির্দিষ্ট সময়ে টিকা পেলেও তাদের মধ্যে মাত্র ৫০ শতাংশের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে। এছাড়া গত দুই বছর ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন না হওয়া এবং অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের সঠিক পুষ্টির অভাব শিশুদের অপুষ্টিজনিত দুর্বলতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সংক্রমণ এড়াতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন শিশুদের নিয়ে সতর্কভাবে চলাচলের পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, “ঈদের সময় শিশুদের ভিড়ের মধ্যে বা বেশি আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে না নেওয়াই ভালো। বিশেষ করে যারা আক্রান্ত, তাদের অন্যদের থেকে আলাদা রাখতে হবে।”
হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় গত ২০ এপ্রিল থেকে দেশজুড়ে ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে জরুরি কর্মসূচি শুরু হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা নেওয়ার পর শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে অন্তত এক মাস সময় লাগে। যেহেতু মে মাসের শেষ পর্যন্ত টিকাদান চলেছে, তাই পূর্ণাঙ্গ ‘হার্ড ইমিউনিটি’ পেতে জুন মাসের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তার আগে এই ঈদযাত্রা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দ যেন বিষাদে পরিণত না হয়, সেজন্য প্রতিটি পরিবারকে সচেতন থাকার এবং শিশুদের ভিড় থেকে দূরে রাখার আহ্বান জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

