মো. আব্দুল কুদ্দুস, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি:
আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে সিরাজগঞ্জের ৯ উপজেলায় কোরবানির পশুর বিশাল প্রস্তুতি লক্ষ করা গেছে। জেলার প্রায় ১৭ হাজার খামারে দেশীয় ও স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতিতে মোটাতাজা করা হয়েছে ৬ লাখ ১৭ হাজার গবাদিপশু। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় ২ লাখ ষাঁড়। প্রাণিসম্পদ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, এসব পশুর সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা।
ঈদ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে জেলার গ্রামাঞ্চলের খামারগুলোতে এখন ব্যস্ততার চিত্র। অধিক লাভের আশায় দিন-রাত পরিশ্রম করছেন খামারিরা। ধানের খড়, সবুজ ঘাস, ভুসি, খৈল ও ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার খাইয়ে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে গরু মোটাতাজা করা হচ্ছে। শুধু সিরাজগঞ্জের চাহিদা পূরণ নয়, প্রতি বছরের মতো এবারও এখানকার পশু দেশের বিভিন্ন জেলার হাটে সরবরাহ করা হবে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন অঞ্চলের পাইকারি ব্যবসায়ীরা খামারগুলোতে ভিড় জমাতে শুরু করেছেন।
প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৩ সালে শাহজাদপুরে মিল্কভিটার দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সিরাজগঞ্জে গবাদিপশুর খামার গড়ে ওঠে। সময়ের সঙ্গে এ খাত এখন জেলার অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হয়েছে। এ বছর দেশীয় জাতের পাশাপাশি শাহিওয়াল, ফ্রিজিয়ান, নেপালি ঘির, রাজস্থানি ও অস্ট্রেলিয়ান জাতের গবাদিপশুও লালন-পালন করা হচ্ছে। তবে খামারিদের বড় দুশ্চিন্তার নাম উৎপাদন ব্যয়। চলতি বছরে গো-খাদ্যের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে তাদের। বর্তমানে সরিষার খৈল প্রতি কেজি ৪৮ থেকে ৫০ টাকা, গমের ভুসি ৫০ থেকে ৫৫ টাকা, ডাবরি ভুসি ৬০ থেকে ৬৫ টাকা এবং কাঁচা ঘাসের আঁটি বিক্রি হচ্ছে ১০ থেকে ১৫ টাকায়। ফলে গরু পালন আগের চেয়ে অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
শাহজাদপুর উপজেলার ভাই ভাই ডেইরি ফার্মের পরিচালক শাহান উদ্দিন জানান, ছয় মাস আগে ৩৪টি গরু কিনে মোটাতাজা শুরু করেন তিনি। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গরুগুলোর পরিচর্যা করছেন। খাদ্যের দাম বাড়লেও ভালো বাজারমূল্যের আশা করছেন তিনি।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার ছোঁয়া মনি এগ্রো ফার্মের স্বত্বাধিকারী হাজি আব্দুস সাত্তার জানান, তার খামারে ৬৫টি গরু দেশীয় পদ্ধতিতে মোটাতাজা করা হয়েছে। গরুর স্বাস্থ্য ও হজমশক্তি বৃদ্ধিতে বিশেষ পুষ্টিকর খাদ্য ব্যবহার করা হচ্ছে।
সিরাজগঞ্জের খান এগ্রোর পরিচালক নির্ঝর খান বলেন, প্রতি বছরের তুলনায় এবার গো-খাদ্যের দাম বেড়েছে প্রতি বস্তায় তিন থেকে চারশো টাকা। ফলে ষাঁড় মোটাতাজাকরণের ব্যয় বেড়েছে খামারিদের। এ বছরে উচ্চমূল্যের গো-খাদ্য খাইয়ে মোটাতাজা করা ষাড় সঠিকমূল্যে বিক্রি করতে পারলে লাভের আশা করছেন তারা। কিন্তু কোরবানির পশুর হাটে যদি ভারতীয় গরু অবাধে বিক্রির সুযোগ দেওয়া হয় তাহলে দেশীয় কোরবানির পশুর ন্যায্য দাম না পাওয়ার আশঙ্কা করছেন প্রান্তিক খামারিরা।
শাহজাদপুর উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডাঃ জাহিদ আল হাসান জানান, উপজেলায় প্রায় ১লাখ ৩৫ হাজার কোরবানির পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। যাহা উপজেলার চাহিদার প্রায় তিন গুণ বেশি। উদ্বৃত্ত পশু গুলো ঢাকা চট্রগ্রাম সহ দেশের বিভিন্ন হাটবাজারে বিক্রির জন্য খামারি ও ব্যাপারীরা নিয়ে যাচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে খামারিরা ন্যায্য মূল্য পেলে এই শিল্পে অনেকেই উৎসাহিত হবে।
সিরাজগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ কে এম আনোয়ারুল হক বলেন, চলতি বছরে সিরাজগঞ্জে ৬ লাখ ১৭ হাজার পশু কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। এর সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা হতে পারে। ঈদকে ঘিরে এখন জেলার গ্রামজুড়ে উৎসবের আমেজ। খামারিদের প্রত্যাশা, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হলে এই খাত দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখবে।

